শুক্রবার,২২ Jun ২০১৮
হোম / ফিচার / #MeToo: হ্যাশট্যাগে নারীর প্রতিবাদ
১২/১৮/২০১৭

#MeToo: হ্যাশট্যাগে নারীর প্রতিবাদ

-

নারীদের বিভিন্ন উপায়ে যৌনহয়রানি বিষয়টি বিশ্বের সব দেশেই নানাধরনের নিন্দা, প্রতিবাদ ও সচেতনতামূলক আলোচনায় থাকলেও খুবই আশ্চর্যজনকভাবে এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া যায় খুবই কম। এমনকি জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও দেখা গেছে যে, এসব ঘটনায় অভিযোগ কম হওয়ার মূল কারণ হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের নির্যাতনের শিকার হিসেবে পরিচয় প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক হন নারীরা।

এছাড়া যৌনহয়রানির সংজ্ঞা বিশ্বজুড়ে এক রকম না হওয়াও এ বিষয়ে নারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাবের একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতিতে নারীদের প্রতি আচরণের মানদন্ড ভিন্ন হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয় বলছেন তারা।

এসব নানা কারণে নারীদের প্রতি আগ্রাসী ও যৌন হয়রানিমূলক আচরণের ব্যাপকতা পরিমাপ করাটা সবসময়ই একটা বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিল। তবে সম্প্রতি হলিউডের প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টাইনের দ্বারা একাধিক স্বনামধন্য অভিনেত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পরে অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানোর শুরু করা #MeToo প্রচারণা নারীদের প্রতি এমন সব আগ্রাসী আচরণের ব্যাপকতার উপর বেশ কিছুটা আলো ফেলতে পেরেছে।

একদম প্রাথমিক অবস্থায় অ্যালিসা মিলানো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীদের প্রতি শুধু ‘মি টু’ শব্দ দুটি লিখে কমেন্ট করে তাদের অভিজ্ঞতা জানানোর আহ্বান জানান। ফেসবুকে তার স্ট্যাটাসের পরিপ্রেক্ষিতে ৪৫ লাখ পোস্ট সৃষ্টি হয়। টুইটারে শুধু তার টুইটেই ৭০ হাজার প্রত্যুত্তর আসে, এবং এই বিষয়ে আরো ১৭ লাখ পোস্ট তৈরি হয় বলে জানিয়েছে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি। বিশ্বজুড়ে ৮৫টির বেশি দেশ থেকে #MeToo সংবলিত পোস্ট আসতে থাকে।

এই প্রচারণাটি একটি বিপ্লবের শুরু বলে মন্তব্য করেছেন অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।

চেক রিপাবলিকের নারী অধিকারকর্মী আন্দ্রেয়া মোলোসিয়া এই প্রচারণায় যুক্ত হয়ে তার দেশের পথেঘাটে পুরুষদের দ্বারা নারীদের শরীরে যথেচ্ছ অযাচিত স্পর্শ, বাজে মন্তব্য শোনাসহ আরো অনেক অভিজ্ঞতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এসব আগ্রাসী আচরণগুলো সমর্থন করার প্রবণতার মধ্যে বেড়ে ওঠার গল্প প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘‘এখন খুব চমৎকার একটা ঘটনা ঘটছে এবং এই প্রথমবারের মতো নারী হিসেবে আমরা এ ধরনের অধীনতার দুঃখ ও হতাশাগুলো প্রকাশের জন্য অভিন্ন একটি ভাষা খুঁজে পেয়েছি’’।

ব্রাজিলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইগারাপে ইনিস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো আদ্রিয়ানা আবদেনুর বলেন, ‘‘বড় হয়ে ওঠার সময় আমাকে শেখানো হতো যে-কোনো পুরুষ আমার চুলের ঝুঁটি ধরে টানলে বা আমার স্কার্ট তুলে ধরলে এর মানে সে আমাকে পছন্দ করে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও আমি দেখেছি যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যৌন হয়রানির ঘটনাগুলোর সংবেদশীলতা বুঝতে অক্ষম থেকে যান। যার ফলে নারীরা তাদের নিপীড়নের ঘটনাগুলো প্রকাশ করতে চান না।’’

তিনি বলেন, ‘‘কেউ ধর্ষিত হওয়ার পরে রিও ডি জেনিরোর পুলিশের কাছে গেলে ভাগ্যক্রমে তারা যদি অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শোনেও, তারপর এমনও ঘটে যে ধর্ষককে আটক করে এনে অভিযোগকারীর সঙ্গে একই ঘরে রাখা হবে। ফলে আপনি যখন আপনার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বলবেন তখন আপনার পাশেই বসে থাকবে আপনাকে নির্যাতনকারী স্বয়ং।’’

দক্ষিণ এশিয়ার নারীরাও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে গেলে একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হন বলে জানিয়েছেন। পাকিস্তানের বেশিরভাগ নারী যৌনহয়রানির বিষয়ে কোনো অভিযোগই করেন না। কারণ শেষ পর্যন্ত পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের দ্বারাও তারা যৌনহয়রানির শিকার হন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাকিস্তানি নারী।

যৌনসহিংসতার বিষয়ে সারা বিশ্বে অসংখ্য গবেষণা ও পরিসংখ্যান থাকলেও যৌনহয়রানি বিষয়ে যে-কোনো ধরনের গবেষণার সংখ্যাই অনেক কম। এর মূল কারণ এই বিষয়ে ধারণাটি মাত্র কয়েক দশক আগে থেকে তৈরি হওয়ার ফলে এর গ্রহণযোগ্য অভিন্ন সংজ্ঞা না থাকা।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সারা কলিনা বলেন, ‘যৌন’ ও ‘হয়রানি’ শব্দ দুটি এর আগে কখনই একসঙ্গে উচ্চারিত হতো না, এবং কোনো সংস্কৃতিতে এর কোনো নির্দিষ্ট অর্থ ছিল না। তবে গ্রহণযোগ্য যৌনাচরণ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং এসব আচরণ পরিবর্তন করা সমসময়ই সময়সাপেক্ষ এবং এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক উদ্যোগ ।

চেক রিপাবলিকের আন্দ্রেয়া মোলোসিয়া বলেন, ‘‘#MeToo-র মত ক্যামপেইনগুলো এক্ষেত্রে অনেক কার্যকর কারণ এগুলো ঝিমিয়ে পড়ার পরে সবাই এর কথা ভুলে গেলেও এসব বিষয়ে নারীদের মধ্যে যে সচেতনতা তৈরি হয় তার রেশ থেকে যাবে। এতদিন সব নারীরা আবেগ সামলাতে সময় নিয়েছে। তারপর নিজের ক্ষত সারার জন্য সময় নিয়েছে। এখন তারা লড়াইয়ের জন্য সময় নিচ্ছে। এরপর যখন নিজের অধিকার আদায়ে লড়াইয়ের ডাক আসবে তখন নারীদের রণক্ষেত্রেই পাওয়া যাবে।’’

- কাজী শাহরিন হক