বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / ‘সৌন্দর্যে’র পরিমাপক কী?
১১/১১/২০১৭

‘সৌন্দর্যে’র পরিমাপক কী?

- জিনাত হাসিবা

বছর চারেক আগে বাংলাদেশের এক সুন্দরী প্রতিযোগিতা দেখে বিতৃষ্ণা আর ক্ষোভ ভরে একটা স্ট্যাটাস শেয়ার করেছিলাম। মূল বিষয়টা মনে আছে। ব্রাইডাল/বধূ সাজের প্রতিযোগিতা ছিল ওটা। আমাদেরই একজন ‘স্বনামধন্য’ নারী মডেল বিচারকের প্যানেল থেকে বলছেন, ‘তোমার সবই ঠিক আছে, কিন্তু চাহনিটা লাজুক হয়নি। বউদের মূল সৌন্দর্য তার লাজুক চাহনিতে। এই লাজুক লুকটা আনতে হবে। পরেবার এটা খেয়াল রেখো।’

এরপরের প্রতিযোগীকে বিচারকদের মধ্যকার সিনিয়র অভিনেত্রী (অবশ্যই ইনিও স্বনামধন্য) বললেন, ‘তোমার হাতগুলো কিন্তু এখনো মোটা মোটা রয়ে গেছে। তোমাকে আরো শুকাতে হবে। তোমাকে আগেরবারও বলেছিলাম, তোমার কিন্তু উন্নতি হয়নি। মডেলিং-এ ফিগারটা ইম্পর্ট্যান্ট।’

এই মেয়েগুলি তো তাদের ‘লক্ষ্যের স্বার্থে’ বিনয়ের সাথে এসব কথা হজম করে গেল। কিন্তু এরপর থেকে আমি নিজের কানের আর চিত্তের আরামের স্বার্থে সুন্দরী প্রতিযোগিতা ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। প্রথমত, কাউকে সুন্দর প্রমাণ করে অন্যদের অসুন্দরের তালিকায় ফেলে দেওয়া ব্যাপারটাই মানুষের মর্যাদাহানির কারণ। দ্বিতীয়ত, সৌন্দর্যের এই শুকনা/লাজুক/মোহনীয়/দীর্ঘকায়/ফর্সা/বড় চোখ/টানা চোখ/খাড়া নাক ইত্যাদি বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যসংবলিত সংজ্ঞায় সুন্দরী প্রতিযোগিতা নেহায়েতই বালখিল্য নয়, এটা রীতিমতো ক্ষতিকর।

দিনে দিনে এই প্রতিযোগিতাগুলোর একাংশকে কোনোমতে মেজেঘষে এই পর্যায় পর্যন্ত আনা গেছে যে, এখানে এসব বৈশিষ্ট্যের সাথে প্রতিযোগীর দক্ষতা, বুদ্ধির ধার এবং ভবিষ্যৎ কর্মধারা সম্পর্কে জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়; কিন্তু গোঁড়ায় গলদ রয়েই গেছে। গৎবাঁধা কিছু সমাজসেবার কথা উঠে আসে এসব পর্বে, তবু অবস্থাদৃষ্টে বিশ্বাস করতে মন সরে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পর্যায়ে ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ সুন্দরী প্রতিযোগিতার রেজাল্ট নিয়ে বারবার নিউজ এলেও আমলে নিইনি। কিন্তু প্রতিযোগী এভ্রিল অযোগ্য এটা প্রমাণ করতে গিয়ে তার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে প্রশংসনীয় অধ্যায়ের সূত্র ধরে তাকে যে, হারে অপমান করা হচ্ছে তা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রসঙ্গ হাত/পা/মুখ/রঙ/ফিগার নয়। এবার প্রসঙ্গ প্রতিযোগীর কুমারিত্ব! প্রতিযোগিতা যখন ‘মিস’ ওয়ার্ল্ড তখন প্রতিযোগীকে তো ‘অবিবাহিত’ হতেই হবে!

প্রথম প্রশ্ন, ‘সৌন্দর্যে’র সাথে বিবাহিত বা অবিবাহিত’ হওয়ার সম্পর্কটা কী?! আর বিবাহিত বা অবিবাহিত যদি শুধু অবস্থা অথবা স্ট্যাটাস নির্দেশ করে সেক্ষেত্রে বিধবা বা ডিভোর্স করেছেন এমন নারী প্রতিযোগিতার নিয়মের মাপকাঠিতে অযোগ্য হয় কি? কী করে?

দ্বিতীয় প্রশ্ন, বিবাহিত বা অবিবাহিত প্রশ্ন? নাকি কুমারিত্ব কিংবা সতীত্ব? ‘সতীত্বেই নারীর সৌন্দর্য’? এরকম কি ব্যাপারটা? আচ্ছা যদি কুমারিত্বই হয়, তাহলে সেটা প্রমাণ হয় কী করে?? যোনীর পর্দা ছিঁড়েছে কি ছেঁড়েনি তাই দিয়ে? সেই পর্দা যৌন সম্পর্কে ছিঁড়েছে নাকি অন্য কোনো কারণে, সেটাই বা কে কিভাবে নির্ধারণ করবে? কী অবান্তর আর অসহ্য যোগ্যতা!

তৃতীয় প্রশ্ন, মানুষের সৌন্দর্য কিসে, এটা ‘আমরা’ কবে বুঝবো? কর্পোরেটদের না হয় অনেক রকম লাভ লোকসানের হিসেব নিকেশ আছে, আমাদের কী হলো? আমরা কেন ঝাঁপিয়ে পড়ে একটা মানুষের ব্যক্তিজীবনের সুন্দর হয়ে ওঠার মূল প্রসেসটাকে ঘিরেই তাকে অপমান করি? কর্পোরেটদের লেন্সে কেন আমরা মাপি মানুষকে? কেন আমরা নির্দিষ্ট মাপ দেওয়ার চেষ্টা করি মানুষকে?

‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এর সমঝদার কিংবা ‘আয়োজক প্রতিষ্ঠানের’ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো আগ্রহ আমার নেই। যারা এর মাধ্যমে নিজেদের পথ খুঁজে নিতে চাইছে নিক, তাতেও আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতা যদি বলে একজন নারী সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে ‘অযোগ্য’ যদি সে ‘কুমারী অথবা অবিবাহিত’ না হয়- আমরাও কেন সাথে সাথে আঙুল তুলে বলি ‘তুমি অযোগ্য! অসুন্দর! কারণ তুমি ‘ব্যবহৃত’!’

বিচিত্র এই দেশের মানুষ। যে কারণে মেয়েটাকে বাহবা দেওয়ার কথা, সেই কারণটাকে অবলম্বন করেই গণহারে তাকে অপমান করছে। স্কুল পেরোতে না পেরোতেই যে মেয়েটা শিশু বিয়ের মতোন অন্যায়ের মধ্যে পড়েও নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি, যে মেয়ে অযাচিত দুঃসহ সম্পর্ক থেকে নিজেকে বের করে আনতে পেরেছে, পরিবারের ভঙুর অবস্থানকে যে জয় করেছে, যে মেয়ে কাঁটা বিছানো পথে হাইস্পিড বাইকার হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেছে, যে মেয়ে নিজের গ-ি ছাড়িয়ে চলে গেছে বহুদূর, তাঁর সৌন্দর্য বিচার করতে ‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এর বুঝদার বিচারক নয়, ‘কিঞ্চিৎ মনুষ্যত্ব’ সম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন।

সুন্দরী প্রতিযোগিতা আর তার ‘সৌন্দর্যের’ সংজ্ঞা এবং ‘নিয়মাবলি’-তে বলিহারি যাই! মেয়েগুলি নিজস্বতায় উজ্জ্বল হোক।

সূত্রঃ ওমেন চ্যাপ্টার