বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / অনন্যা ও নারীঃ তিন দশকের বিস্ময়যাত্রা
১১/০২/২০১৭

অনন্যা ও নারীঃ তিন দশকের বিস্ময়যাত্রা

-

একে একে অনন্যা পার করল ত্রিশটি হেমন্ত! জীবনানন্দ দাশ যেমনটি বলেছেন-‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে/হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল...।’ অঘ্রাণের সোনালী ফসল ঘরে ওঠে এ সময়। নবান্নের অপরূপ দোলনায় দোল খায় গ্রামবাংলার প্রতিটি ধুলিকণা। সকালের ঠান্ডা হিমেল ঘাসের ফাঁকে শোনা যায় শিশিরের শব্দ, আর শেষ বিকেলে কন্যাসুন্দরী আলো নিভে গেলে দিগন্তবলয়ে লম্বা হয়ে ঝুলে থাকে কুয়াশার চাদর। ঠিক তেমনই এক হেমন্তে ত্রিশ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল পাক্ষিক অনন্যা। অতঃপর অনন্যা একে একে পার করেছে শৈশব, কৈশোর, বয়োসন্ধিকাল। ছুঁয়েছে দুঃসহ আঠারো। এভাবেই কেটে গেছে আরো এক যুগ।

অনন্যা এমনই তিনটি দশকের সাক্ষী-যে সময় দ্বিমেরু যুগের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বে শুরু হয়েছে বহুমেরু যুগের, পতন ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের, চালু হয়েছে মুক্তবাজার অর্থনীতি, ঘটেছে নাইন-ইলিভেনের মতো তোলপাড় করা ঘটনা। আর এসবের মধ্যে নীরবে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে তথ্যপ্রযুক্তি নামের এক রূপকথা-বিজ্ঞান। তিনটি ডাব্লিউ তথা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব পুরো বিশ্বকে পরিণত করেছে বিশ্বগ্রামে। বাংলাদেশও চড়ে বসেছে সেই বিশ্বভেলায়। মুখোমুখি হয়েছে নতুন যুগের কত ধরনের বন্ধুর পথের। আর এসবের ভেতর দিয়েই মুক্তবাতাস অবারিত হয়েছে নারীসমাজের অন্দরে।

বাংলাদেশের নারীদের অনুপ্রেরণার একটি প্লাটফরম হওয়ার চেষ্টা করেছে পাক্ষিক অনন্যা। এজন্য ১৯৯৩ সাল থেকে চালু হয়েছে অনন্যা শীর্ষদশ। সামাগ্রিকভাবে দুশোর বেশি কৃতি নারীকে সম্মানিত করেছে অনন্যা শীর্ষদশ। এক্ষেত্রে আমরা সাক্ষী থেকেছি বাংলাদেশে নারী জাগরণের বিস্ময়কর পথপরিক্রমার। অভাবিত ব্যাপার এই যে, আড়াই দশক আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা দশজন নারী খুঁজে পাওয়া খুব বেশি সহজ ছিল না। আর এখন? সম্ভবত সমাজে বিশেষ অবদান রাখা একশো নারীকে খুঁজে পেতেও এখন খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। বলা যায়, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দৃষ্টান্ত। বর্তমানে এ-দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পীকার এবং সংসদের উপনেতা-সবাই নারী। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, সচিবালয়, পুলিশ, সশস্ত্রবাহিনী, ইউএন শান্তিকর্মী ইত্যাদিতে নারীর সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই নারীর ক্ষমতায়নের উন্নতি নির্দেশ করে। কৃতী নারীরা বারবার প্রমাণ করেছেন-নারীকে সুযোগ দেওয়া হলে তিনি তাঁর সর্বোচ্চটা দেন। কিন্তু এখনো এই দেশে নারীকে এগোতে হয় দুয়ার ভেঙে ভেঙে। অনন্যা’র প্রকাশও তেমনই এক দুয়ারভাঙার গল্প। তবে অনন্যা’র মধ্যেই রয়েছে এক স্বয়ম্ভু শক্তি। সেই শক্তিই ভেঙে ফেলে সকল প্রতিবন্ধকতা। অনন্যা এখন এক সংগ্রামের নাম। গৌরব ও ঐশ্বর্যের নাম। এই কারণে গত ৩০ বছরে নিরবচ্ছিন্নভাবে অনন্যার নান্দনিক প্রকাশ ভুলিয়ে দেয় সব কষ্ট।

বর্ষপূর্তির এই শুভক্ষণে যাঁরা প্রায় তিন দশক ধরে ‘অনন্যা’কে অনন্যা-রূপে প্রকাশিত হতে কোনো না কোনোভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা।

নারীর স্বয়ম্ভু শক্তিতে প্রাণ ফিরে আসুক বিশ্বের সকল বন্ধ্যা সমাজে।

- তাসমিমা হোসেন