বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / রোহিঙ্গা সংকট ও থার্বারের ‘খরগোশ, যারা সকল সমস্যার কারণ ছিল’
১০/২২/২০১৭

রোহিঙ্গা সংকট ও থার্বারের ‘খরগোশ, যারা সকল সমস্যার কারণ ছিল’

-

[জেমস থার্বার (১৮৯৪-১৯৬১) জনপ্রিয় মার্কিন কার্টুনিস্ট, নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিক। পেশায় সাংবাদিক। ছোটগল্প দিয়ে থার্বার জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর সময়ে তাঁকে অন্যতম রসিক লেখক হিসেবে মানা হত। রসবোধটা থার্বার তার মায়ের কাছ থেকে শেখেন। নিজের মাকে থার্বার ‘বর্ন কমেডিয়ান’ বলে মনে করতেন। বর্তমান গল্পটি ফেবল বা কথারূপক। থার্বার প্রতীকী এই গল্পটি লেখেন ১৯৩৯ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত বিষয় হলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন। থার্বারের এই গল্পটি থেকে আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার এবং বিশ্বশক্তির অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারি।]

সবচেয়ে অল্প বয়সী শিশুটার মনে আছে- নেকড়ে অধ্যুসিত এলাকায় খরগোশদের একটা পরিবার বাস করতো। নেকড়েরা জানিয়ে দিলো যে, খরগোশদের জীবনযাপনের রীতি-নীতি তাদের পছন্দ না। এক রাতে ভূমিকম্পের কারণে একদল নেকড়ে মারা পড়লো। আর দোষ গিয়ে পড়লো খরগোশদের ঘাড়ে। কেননা সবার জানা যে, খরগোশরা পেছনের পা দিয়ে মাটি আচড়িয়ে ভূমিকম্প ঘটায়। আরেক রাতে বজ্রপাতে নেকড়েদের একজন মারা পড়লো। আবারো দোষ গিয়ে পড়লো ঐ খরগোশদের ওপরে। কারণ সবাই জানে যে, লেটুস পাতা যারা খাই তাদের কারণেই বজ্রপাত হয়। একদিন খরগোশদের সভ্য ও পরিপাটি করার জন্যে নেকড়েরা হুমকি দিলো। ফলে খরগোসরা সিদ্ধান্ত নিলো যে, তারা নিকটবর্র্তী দ্বীপে পালিয়ে যাবে।

কিন্তু অন্যান্য জন্তু-জানোয়াররা যারা খানিক দূরে বসবাস করতো তারা ভর্ৎসণা করে বলল- তোমরা যেখানেই আছ বুকে সাহস বেঁধে সেখানেই থাকো। এ পৃথিবীটা ভিতু-কাপুরুষদের জন্যে নয়। যদি সত্যি সত্যি নেকড়েরা তোমাদের ওপর আক্রমণ করে আমরা এগিয়ে আসবো তোমাদের হয়ে।

কাজেই খরগোশরা নেকড়েদের পাশে বসবাস করতে থাকলো। এরপর এক ভয়াবহ বন্যা হল, সেই বন্যায় আবার নেকড়েদের অনেকেই মারা পড়লো। এবারও যথারীতি দোষ গিয়ে পড়লো ঐ খরগোশ পরিবারের ওপর। কারণ সবাই জানে যে, যারা গাজর কুরে কুরে খায় এবং যাদের বড় বড় কান আছে তাদের কারণেই বন্যা হয়। নেকড়েরা দল বেঁধে খরগোশদের, তাদের ভালোর জন্যেই, ধরে নিয়ে গেল এবং তাদের নিরাপত্তার জন্যেই তাদের একটি অন্ধকার গুহার ভেতরে আটকে রাখলো।

যখন কয়েক সপ্তাহ ধরে খরগোশদের কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্যান্য যন্তু-জানোয়াররা নেকড়েদের কাছে জানতে চাইলো খরদোশদের ব্যাপারে। নেকড়েরা জানালো যে, খরগোশদের সাবাড় করা হয়ে গেছে। যেহেতু তারা সাবাড় হয়ে গেছে সেহেতু এটা এখন তাদের একান্ত নিজেদের বিষয়। কিন্তু অন্যান্য যন্তুরা হুমকি দিয়ে জানালো, যদি খরগোশদের খাওয়ার উপযুক্ত কোনো কারণ না দেখানো হয় তাহলে তারা সব একত্রিত হয়ে নেকড়েদের বিপক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সুতরাং নেকড়েদের একটি যুৎসই কারণ দশাতেই হল। তারা বলল- খরগোশরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল এবং তোমরা ভাল করেই জানো যে পলাতক-কাপুরুষদের জন্যে এ দুনিয়া না!

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে গল্পটির পাঠ ও বিশ্লেষণ

গল্পটি লেখা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাককালে। গল্পকার থার্বার হয়ত খরগোশ বলতে জার্মানির ইহুদিদের বুঝিয়েছেন। আর নেকড়েরা হল নাজি। কিংবা খোরগোশদের সঙ্গে উনিশ শততে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের তুলনা চলে। ক্ষমতাসীনরা হল নেকড়ে। আরও ব্রডভাবে বিশ্বের যে কোনো সম্প্রদায়ের সংখ্যালুঘুর অবস্থাকে খরগোশের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আর সংখ্যাগুঘুরা হল নেকড়ে। সম্প্রতি, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবস্থা আমরা জানি। তাদের নানা অজুহাতে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা সমস্যার সমাধানে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো ও জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছে। সবাই যুৎসই সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। মিয়ানমারের ওপর চাপও সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। মাঝখান থেকে রোহিঙ্গারা জাতিগতভাবে বিলুপ্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই গল্পে বলা হয়েছে, পলাতকদের জন্যে এ পৃথিবীতে কোনো স্থান নেই। এটি ঐতিহাসিক সত্য। রোহিঙ্গারা যদি কোথাও পালিয়েও যায়, তাদের অবস্থা একই হবে।

গল্পে দেখা যাচ্ছে- ভূমিকম্প, কিংবা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ প্রাণী খরগোশকে দায়ী করা হচ্ছে। এটা অযৌক্তিক বা অ্যাবসার্ড, আমরা জানি। কিন্তু তবুও প্রতিবার বলা হয়েছে, ‘সবাই জানে যে, যারা গাজর কুরে কুরে খায় এবং যাদের বড় বড় কান আছে তাদের কারণেই বন্যা হয়।’ অর্থাৎ ঘোষণার মধ্যেই বলে দেওয়া হচ্ছে যে, তুমি মানো আর না মানো, বিষয়টা সবাই জানে! এখানে একটা মিথ্যেকে সত্য বলে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশ কিছুদিন থেকে আমরা দেখছি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নানা অজুহাতে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা পালাতে চাইলে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। তারা সমব্যথী হয়ে বলছে, পালানোটা কোনো সমাধান না। ওখানে থেকে সমাধান খোঁজার কথা বলা হচ্ছে। সমস্যার সমাধানে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছে। জাতিসংঘ আশ্বাস দিচ্ছে। মিয়ানমারের কাছে এর জবাব চাওয়া হচ্ছে। মাঝখান থেকে রোহিঙ্গারা জাতিগতভাবে বিলুপ্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই গল্পে বলা হয়েছে, পলাতকদের জন্যে এ পৃথিবীতে কোনো স্থান নেই। এটিও ঐতিহাসিক সত্য। রোহিঙ্গারা যদি কোথাও পালিয়েও যায়, তাদের অবস্থা একই হবে। তাদের জাতিগত আইডেনটিটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

গল্পটিকে সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় এলিগরি হিসেবেও দেখার সুযোগ আছে। পৃথিবীর বহু ধর্ম ও ক্ষুদ্র-ভাষাভাষি নৃগোষ্ঠী খরগোশদের মতো কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। প্রতিদিন একটু একটু করে আরও অনেক জনগোষ্ঠী বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। গল্পটিকে আমরা বর্তমান মার্কিন আগ্রাসনবাদের রূপকগল্প বা এলিগরিক্যাল টেল হিসেবেও দেখতে পারি। আমেরিকা বিভিন্ন অজুহাতে আফগান-ইরাকে হামলা চালিয়েছে। অনন্যা দেশ এর উপযুক্ত কারণ আমেরিকার কাছে চেয়েছে। আমেরিকা জানিয়েছে, তারা বিশ্বের ভালোর জন্যেই সন্ত্রাসদমনে নেমেছে। খোরগোশদের ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় নেকড়েরা যেভাবে বলেছে যে খোরগোশদের ভালোর জন্যে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; তেমনি করে আফগানি-ইরাকি-পাকিস্তানি এবং লিবিয়ার জনগণকে মার্কিন প্রশাসন বোঝাচ্ছে যে তারা কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে এটা আসলে স্থানীয়দের মঙ্গলের জন্যেই। সত্য-মিথ্যা সকলে জানেন, কিন্তু সেই জানা না-জানা মার্কিন আগ্রাসী চেতনায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

- অনুবাদ ও বিশ্লেষণঃ মোজাফ্ফর হোসেন