শুক্রবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / খাবার-দাবার / বাংলা নববর্ষ ও দেওয়ান বাড়ির হেঁশেল
০৪/০১/২০১৬

বাংলা নববর্ষ ও দেওয়ান বাড়ির হেঁশেল

-

মরমি কবি হাসন রাজার আদরের নাতনি এবং খানবাহাদুর দেওয়ান গনিউর রাজার কন্যা সাজিদুননেসা চৌধুরানী ওরফে পেয়ার-চান্দ- এর অভিজ্ঞতায় সেই সময়কার জমিদারবাড়ির নববর্ষ উৎসব উদ্যাপন ও কয়েকটি বনেদি রান্নার প্রণালি নিয়ে কথা বলেছেন ছড়াকার, লোকসাহিত্য গবেষক ও হাসন রাজার প্রপৌত্রী সাদিয়া চৌধুরী পরাগ

বাংলা নববর্ষের ২-৩ দিন আগে সদ্যপ্রকাশিত একটি ছোট্ট পুস্তিকা পানাইল-দোহালিয়া এস্টেটের ১২৪টি মৌজায় এক রকম আনন্দ সওগাত বয়ে নিয়ে আসতো, সে অঞ্চলের গ্রামীণ লোকসমাজে। নব-পঞ্জিকায় কুশল মঙ্গলের সূচনাক্ষণ, হৃদয় উৎফুল্লতায় যেমন ভরিয়ে দিতো, অশনি-সংকেত তেমনি উৎকর্ণ্ঠার প্রতিফলন ঘটাতো। তবে, এসব কিছুর মধ্যে পহেলা বৈশাখের আগমনি আবহ সর্বশ্রেণির জনগণের প্রাণে পরম আরাধ্যকে পাওয়ার মতো প্রমোদ আনন্দে মাতিয়ে রাখতো।

এই বাংলায় পহেলা বৈশাখ বিশেষ দিনে চিহ্নিত হয়ে ওঠে, বাৎসরিক খাজানা আদায়ের প্রতীকী ফলকরূপে। সেকালের ভারতবর্ষের ভাগ্যবিধাতা সম্রাট জালাল উদ্দিন আকবর এই প্রথার প্রবর্তক হয়ে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রয়েছেন। এবং সেকাল থেকে ১৯৫৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলার ঘরে ঘরে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হয়েছে, নওরোজের সম্মান সম্ভ্রমে।

বিশাল বাংলার জমিদারদের প্রকা- আঙ্গিনাচত্বর, কাচারি বাংলাসমূহ, প্রজা-সাধারণের পদচারণায় পদধুলি সত্তপাগারে পরিণত হতো। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলতো খাজনা আদায়ের মহেন্দ্রক্ষণ -- তৌজি ফারগ ইত্যাদি গ্রহণ ও প্রদানের সময়। এর এদিক সেদিক হওয়ার উপায় ছিল না।
সুনামগঞ্জের পানাইল-দোহালিয়া এস্টেটের জমিদারের ক্ষেত্রে এ নিয়মের অন্যথা হতো না। অন্দরবাড়ির অনতি দূরে, কাঁটা মেহেদীর ছাঁট-কাটের বনেদিয়ানা প্রাকৃতিক দেয়াল বেষ্টনীর নিবিড় ঘেরা-টোপ পারিবারিক রক্ষণশীলতার প্রহরী হয়ে থাকলেও সেদিন এতটা কঠোর হতো না যেন।

বেশ প্রত্যক্ষ করা যেত, নয়া বাংলা, বড় বাংলা কাচারিঘর এবং বকুলতলায় উপচেপরা জনতার ভিড়। নায়েব, মোশায়েব, মুহুরি, পেয়াদা, পাইকের হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকির কল-গুঞ্জন। উপরন্তু, খাজনা প্রদানকারী হিন্দু-মুসলমান প্রজা-সাধারণের জন্যে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনে ব্যাস্ত মানুষের আনাগোনা চোখে পড়তো। জাতি ধর্ম অনুসারে পৃথকভাবে রান্নার ব্যবস্থা হতো। এবং এতে থাকতো খিচুড়ি ও লাবড়া। মাছ, মাংসবর্জিত এই নিরামিষ ভোজের আয়োজন হতো শুধুমাত্র সনাতন ধর্মীয় প্রজাদের সম্মানার্থে। উপরন্তু কোনো কোনো স্বাত্তিক ধর্মাচারীদের জন্যে চিড়া, মুড়ি, দুধ, দই, কলা এবং গুড়ের ব্যবস্থা থাকতো। এসবকে বলা হতো সিধা।

তবে, অন্দরবাড়ির জমিদার কর্ত্রীদের বা দেওয়ান-বিবিদের হেঁশেলঘরে পুরোপুরি আমিষবর্জিত ব্যঞ্জন রান্না হতো না। মাংসের অনুপস্থিতি থাকলেও আমার আম্মা, যাকে সাধারণ জনগণ ‘ঢাকার বিবি’ বলে সম্বোধন করতো তার রান্নাঘরেথাকতো এক প্রকারের সবজি, ‘মোঘল-খোশ’, ‘মাছলি কাবাব’ এবং ‘পেয়ার পছন্দ’।
আমার আম্মাকে এস্টেটের জনগণ ঢাকার বিবি বলে পরিচয়দান করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন, মরমি কবি হাসন রাজার অত্যন্ত আদরের নাতনি এবং খানবাহাদুর দেওয়ান গনিউর রাজার কন্যা সাজিদুননেসা চৌধুরানী ওরফে পেয়ার-চান্দ। তার আম্মা মোঘল-জাদী হাকিকুননেসা মীর্জা ছিলেন দিল্লীর বাদশাহ বাহাদুরশাহ আলমের উত্তরসূরিদের একজন। দাদা-দাদি, নানা-নানির রক্তগ্রোতের বাহক আমার আম্মার রক্তে সেমেটিক, আর্য, মোঘল এই তিনটি প্রাচীন জাতির মিলিত ধারা প্রবাহিত ছিল। আম্মা ছিলেন স্থিতধী, ধার্মিক, সহিষ্ণুপ্রাণ, পরমাসুন্দর রমণী। রান্না-বান্না, সেলাইকর্মেও ছিলেন সুদক্ষ এবং প্রকৃত গৃহিণী।
তার হাতের বৈশাখি তিনটি রান্নার রেসিপি এখানে দেয়া হলঃ

সবজি মোঘল খোশ
উপকরণ
১ কেজি ঝিঙ্গা, ৬টি ডিম, ৩ টেবিল চামচ পেঁয়াজবাটা, দেড় টেবিল চামচ রসুনবাটা এবং অল্প পরিমাণ ধনের গুঁড়ো, স্বাদমতো লবণ, পরিমাণমতো ঘি বা সর্ষের তেল ও কাঁচালংকা ৩/৪ টি।
প্রণালি
প্রথমে ঝিঙ্গেগুলো ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে নেবেন। পরে পাতলা চাক করে কুটে আবার একটু ধুয়ে পানি ঝরিয়ে রাখবেন। একটি বাটিতে ৬টি ডিম ভেঙে কুসুম আলাদা করে রাখুন। ডিমের সাদা অংশ এগ বিটার দিয়ে ফেটিয়ে রাখুন। পরে একটা কড়াই উনুনে চড়িয়ে এতে পরিমাণমতো ঘি বা সর্ষের তেল (অথবা সয়াবিন তেল) ঢেলে তাতিয়ে নেবেন এবং তাতানো ঘি বা তেলে পেঁয়াজবাটা, রসুনবাটা, ধনেরগুঁড়ো অর্থাৎ মশলা কষিয়ে চাককরা ঝিংগে ছেড়ে দিন। হাতা দিয়ে নেড়ে সামান্য সময় ঢেকে রাখুন। ঝিঙ্গের নিজস্ব পানি শুকিয়ে এলে ডিমের সাদা অংশ যেটি ফেটিয়ে রাখা হয়েছিল তার সবটুকুন কষানো ঝিংগের উপর ছেড়ে দিন ও অনবরত নাড়তে থাকুন যেন মামলেটের আকার না নিতে পারে। ডিমের সাদা অংশ সবজির সঙ্গে মিশে গেলে লক্ষ্য রাখবেন, এর উপরে ঘি বা তেল উঠে আসছে কিনা। যদি ঘি বা তেল রান্নাকরা সবজির উপরে উঠে আসে তখন এতে কয়েকটি কাঁচালংকা ও ধনেপাতার কুচি ছড়িয়ে কড়াই নামিয়ে ফেলুন। দেখবেন, চমৎকার স্বাদের মোঘল খোশ প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে। পরিবেশনকালে সুন্দর মাঝারি প্লেটে টমেটো, গাজর ও ধনেপাতা দিয়ে সাজিয়ে দেবেন।

মাছলি কাবাব
একটি ১ কেজি থেকে দেড় কেজি ওজনের ঘনিয়া মাছ অথবা রুই/কাতল মাছকে আঁশ ছাড়িয়ে মুড়ো ও লেজ আলাদা করে ফেলুন।
বাকি মাছের নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করে শুদ্ধিচারে মাছ ধুয়ে ফেলুন। মাছ ধুয়ে একটা পাতিলে সামান্য লবণ মাখিে য় ভাপ দিতে থাকুন।
ভাঁপের মাছ সিদ্ধ হয়ে গেলে নামিয়ে ঠান্ডা করুন ও কাঁটা ছাড়াতে থাকুন। কাঁটা ভালোভাবে ছাড়ানোর জন্যে চিকন ছিদ্রের চালুন ব্যবহার করতে পারেন। অপর একটি পাতিলে ছোলার ডাল (পরিমাণমতো) সিদ্ধ করে চটকিয়ে রাখুন। পরে কাঁটা ছাড়া মাছের সঙ্গে চটকানো ছোলার অনুপান মিশিয়ে নিন।
সেই সঙ্গে ৩ টেবিল চামচ পেঁয়াজবাটা, ১ টেবিল চামচ আদাবাটা, আধা টেবিল চামচ রসুনবাটা, পরিমাণমতো ধনের গুঁড়ো, জিরার গুঁড়ো ও স্বাদমতো লবণ, ধনেপাতাকুচি, কাঁচালংকা কুচি মিশিয়ে কাবাব আকৃতির করে রাখুন। পরে ফেটানো ডিমে ডুবিয়ে বিস্কুট গুঁড়ো ছিটিয়ে গরম তেলে ভেজে ফেলুন। গরম গরম মাছলি কাবাব আতপচালের ভাতে অন্যরকম স্বাদ আনে ও রসনা তৃপ্ত করে। কাবাব পরিবেশনকালে পছন্দ মতো ডিশে সাজাতে পারেন। এতে প্রাণেরও তৃপ্তি ঘটে।


পেয়ার পছন্দ
পহেলা বৈশাখ কখনো নানাবাড়ি পানাইল-দোহালিয়া এস্টেটে কাটেনি। তবে মায়ের মুখে শুনেছি হিন্দু-মুসলমানের এক বিশাল মিলনমেলার কথা। সেদিনের উৎসবে কোনোরকম মাংস রান্না হতো না। তবে বিবিমহলের হেঁশেলে কিছু বাহারি খানার আয়োজন হতো। সেরকম একটা মুখরোচক মিষ্টির কথা এখানে বলছি। আমার নানু সাজিদুননেসা চৌধুরানী ওরফে পেয়ারচান্দ বিবির অত্যন্ত প্রিয় রান্না এটি। হয়তবা তাঁর পছন্দের মিষ্টি বলে এর নাম ‘পেয়ার পছন্দ’ নির্ধারিত হয়েছে।
৬টি মুরগির ডিম ফেটিয়ে রাখবেন। ডিমের কুসুম ও সাদা অংশ এগ বিটারে ভালো করে ফেটিয়ে রাখুন। স্বাদমতো চিনি ঢেলে নাড়াচাড়া করুন। পরে চিনি মিশে গেলে একটি কড়াইয়ে ঘি ঢালুন। ঘি তেতে উঠলে ফেটানো ডিম ছেড়ে অনবরত নাড়তে থাকুন যেন মামলেট আকার না ধারন করে। ডিম নেড়ে হালুয়ার মতো হয়ে গেলে এর উপরে পোয়াখানেক দুধের ছানা ঢালুন ও যথেষ্ট পরিমাণ চিনি দিয়ে নেড়ে কিসমিস, পেস্তাবাদাম ছেড়ে নামিয়ে ফেলুন। ডিম ও ছানার মিশেল মিষ্টি দ্রব্য বরফি আকার করে পরিবেশন করুন। নতুবা হালুয়ার মতোই ‘পেয়ার পছন্দ’ পরিবেশন করতে পারেন। এই ‘পেয়ার পছন্দ’ পানাইল-দোহালিয়া এস্টেটের দেওয়ান বাড়ির হেঁশেল দখল করতো পহেলা বৈশাখে।