সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / একজন রূপা এবং কতক বিবেচ্য প্রসঙ্গ
০৯/২৮/২০১৭

একজন রূপা এবং কতক বিবেচ্য প্রসঙ্গ

-

ক. ‘নিরাপদ’ বাসে ‘অনিরাপদ’ নারী

ছোঁয়া পরিবহনের বাসটির নাম ছিল ‘নিরাপদ’। বাসের ঠিক পেছনে ইংরেজিতে লিখা ছিল, ‘গড ব্লেইস ইউ’। ড্রাইভারের মাথার কাছে ছোট্ট করে লেখা ছিল ‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহর নামে চলিলাম’। অন্যদিনকার মতো সেদিনও নিরাপদে পৌঁছেছে বাসটি। নিরাপদে পৌঁছেছে বাসের ড্রাইভার, কন্ট্রাকটর ও হেলপার। বাসটি রাস্তার কোথাও এতটুকু টলেনি, ধাক্কা খাইনি কোনো গাছ কিংবা বিপরীত দিক থেকে আসা কোনো গাড়ির সঙ্গে। তারপরও বাসের মাত্র একজনই যাত্রী ছিল, সে মৃত। রক্তাক্ত। বাস থেকে তার রক্তাক্ত লাশ ছিটকে পড়েছে রাস্তার ধারে। এরপর বাসটি নিরাপদে পৌঁছে গেছে তার গন্তব্যে!

গল্পের ভিকটিম চরিত্রটি বাংলাদেশের কোনো এক অখ্যাত গাঁয়ের অপরিচিত মেয়ে রূপা না হলে এই অংশটি কোনো জাদুবাস্তব গল্পের সূচনা-অংশ হিসেবে গণ্য হতে পারত। কিন্তু রূপা কোনো জাদুবাস্তব গল্পের চরিত্র না- বাংলাদেশের নিরেট এক বাস্তবতা। ‘নিরাপদ’ বাসটি এখন বাংলাদেশের অতিবাস্তব রূপকচিত্র। নিরাপদেই চলছে দেশ। হয়ত গন্তব্যে পৌঁছেও যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শুধু গন্তব্যে পৌঁছেতে পারছে না একা এক-নারী।

রূপা হয়ত একবার বিশ্বাস করেছিল অলৌকিক কোনো পাখি এসে উঠিয়ে নেবে তাকে। কিংবা সে ওর জীবনের সমস্ত ভালো কাজের বিনিময়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছিল একটি দুঃস্বপ্নের। হয়ত একবার ও ভাবে জানালাটা সরিয়ে লাফ দেবে বাইরে। আবার ও ভাবে, ও বেঁঁচে থাকবে নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য। শুধুই কি স্বপ্ন? বাবা-মরা মেয়ে, অভাবের সংসারে ভাইয়ের প্রচেষ্টায় পড়াশোনা শেষ হয়েছে। বয়স হয়েছে মায়ের, তারও নিরাপত্তা দরকার। এই দায়িত্ববোধকে অবহেলা করে লাফ শেষপর্যন্ত আর লাফ দেয়নি সে। ছোটখাটো আরো কত সাধ ওর- বাড়ি ফিরেই মাকে চমকে দেবে বেতনবৃদ্ধির খরবটা দিয়ে, এই ঈদে পাড়ার শিশুদের নিয়ে হৈ-হল্লা করবে, দু-টাকা, পাঁচ টাকা করে ঈদ বোনাসও দিতে পারবে। ঈদের পর পাড়ার ক্রিকেট-পাগল ছেলেদের সঙ্গে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার শেষ টেস্টটা দেখবে। যদি সিরিজটা সত্যিই বাংলাদেশ জিতে যায়- ভেবেই ওর মনটা মুহূর্তের জন্য চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ততক্ষণে ওর শরীরটা অবশ হয়ে যায় কতগুলো মানুষরূপী পশুর নৃশংস থাবায়। শেষবারের মতোন হয়ত চিৎকার করেছে রূপা- এবার আর বাঁচার জন্য নয়, সৃষ্টিকর্তা কিংবা মানুষ কারো কাছে কোনো প্রত্যাশা নিয়ে নয়- ধিক্কারে, নিজের নারীজন্মের ধিক্কারে। ধিক্কার দিয়েছে পৃথিবীর সুন্দর-অসুন্দর সমস্ত কিছুকে।

রূপা ধর্ষণের শিকার হয়ে খুন হয়েছে কথিত ‘নিরাপদ’ বাসে কিংবা বাংলাদেশে। কতগুলো পুরুষ মানুষের চূড়ান্ত নৃশংস আচরণের সাক্ষী হয়ে। সেই পুরুষগুলো এখন চিহ্নিত। অপরাধ অস্বীকার করার সুযোগ তারা পায়নি। কিংবা তারা নিজেরাই অকপটে স্বীকার করেছে কোনো এক অদৃশ্য ‘শক্তিবলে’। কে জানে কত রূপার রক্ত তাদের হাতে? হোক না সামান্য ড্রাইভার-হেলপার-কন্ট্রাকটর- ‘শক্তি’ যে ওদের থাকে সেটা আমরা জানি বলেই এমন পাশবিক ধর্ষণ ও নৃশংস খুনের পরও আমাদের চিহ্নিত খুনিদের বিচার চাইতে হচ্ছে। বিচার চেয়ে রাজপথে দাঁড়াতে হচ্ছে প্ল্যাকার্ড হাতে। আমাদের চোখে-মুখে শঙ্কা। আমরা বার বার পরাজিত হয়েছি। তনুর ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চেয়ে না পাওয়ার ব্যর্থতা আমাদের শক্ত করে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। আমাদের মাথা নত হয়ে আসছে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারার অপরাধে। আমরা বুঝতে পারছি না, রূপা হত্যার বিচার করতে আইনমন্ত্রীকে কেন ফোন করতে হবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে? জড়িতদের শাস্তির দাবি নিয়ে মাঠে নামতে হবে কেন আইনজীবীদের? একটা মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে- সমাজে এর চেয়ে বড় কোনো অপরাধ নেই। খুনিরা নিজেদের অপরাধ স্বীকারও করেছে। এরপরও কেন আমাদের এভাবে মরিয়া হয়ে বিচার চাইতে হবে? কেনই বা কোনো কোনো আইনজীবী এই খুনিদের পক্ষে লড়বেন? কেনই বা রূপার মৃতশরীর পরীক্ষা করে ধর্ষণের আলামত খোঁজা হবে?

খ. ধর্ষণ-পরবর্তী বাস্তবতা

ঘটনার তুলনায় বরাবরই মামলা কম হয় আর মামলার নিষ্পত্তি হয় আরো কম। দৈনিক প্রথম আলোর সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ধর্ষণের ঘটনায় ১৬ বছরে সরকারের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ৪ হাজার ৫৪১টি মামলা করেছে। এর মধ্যে মাত্র ৬০টি ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি হয়েছে। ৭৩ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না বলে ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন হচ্ছে।

বিচার চেয়ে উল্টো ভোগান্তির কারণে পরিবার ও সমাজের চাপে অধিকাংশ নারী ধর্ষণের কথা বলতে চান না। প্রথম আলোর ঐ প্রতিবেদনে ধর্ষণের শিকার এক নারী জানান, ‘ঘটনাস্থল হাজারীবাগ না লালবাগ, সে নিয়েই প্রথমে আমাকে দ্বিধায় ফেলে দেয় পুলিশ। আট ঘণ্টা চেষ্টার পর আমি হাজারীবাগ থানায় মামলা করি। পুলিশ আমাকে বলে, মামলা করতে ছবি তুলতে হবে। আমি একটু অস্বস্তিবোধ করছিলাম। পুলিশ তখন টিপ্পনী কেটে বলে, ধর্ষণের মামলা করতে শরম লাগে না, আর ছবি তুলতে শরম?’ শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য আদালতে বহু মানুষের সামনে নাকি আসামিপক্ষের আইনজীবী ঐ নারীকে যৌনকর্মী বলে মন্তব্য করে।

ধর্ষণের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য অনেক সময় দেরি করে আসেন বলে আলামত নষ্ট হয়ে যায়। তার ওপর ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ ততটা শক্তিশালী নয়। ঢাকাসহ কয়েকটি মেডিকেল কলেজের বাইরে এই বিভাগের অবস্থা খুবই নাজুক। ভুল প্রতিবেদন আসার সম্ভাবনাও থেকে যায়। এসব কারণে ধর্ষণের শিকার নারীকে নানারকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ফলে নিজের বেঁচে থাকাটাকে অভিশপ্ত বলে মনে হয় তার কাছে। একবার এক ধর্ষিত নারী যে কারণে আত্মহত্যার একটি নোটে লিখে গিয়েছিল, ধর্ষকদের অসমাপ্ত কাজটা আমি নিজেই করলাম। সমাজ ও সিস্টেমের হাতে প্রতিনিয়ত একটু একটু খুন হওয়ার চেয়ে আত্মহত্যা শ্রেয়। ধর্ষণপরবর্তী অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে আমাকে একবার এক নারী জানিয়েছিলেন, ধর্ষকদের চেয়ে এই সমাজ খারাপ, কারণ ওরা ধর্ষণ করে একটা মাপা সময়ধরে। এবং ওরা চিহ্নিত হয় ধর্ষক পরিচয়ে। কিন্তু আড়ালে এই সমাজ ধর্ষণ করে প্রতিনিয়ত, তিলে তিলে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের কেন এই বৈপরীত্য?

আমরা জানি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, যেখানে গণভোটে সরকার নির্বাচিত হয় সেখানে ক্ষমতাসীন সরকার জনগণের সেন্টিমেন্ট, প্রত্যাশা ও দাবির কাছে নতি স্বীকার করে। যখন গোটা দেশের মানুষ তনু-হত্যার বিচার চেয়ে রাজপথে নেমেছে তখন জনগণের চেয়ে কোন বড় শক্তির কাছে সরকার বশ্যতা স্বীকার করেছে আমরা জানতে চাই। বাসের ড্রাইভার-হেলপাররা কোন শক্তির ছায়াতলে জনগণের সমষ্টিগত শক্তির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সেটিও আমাদের জানা দরকার।

প্রতিকার এবং প্রতিরোধ

প্রতিকার এবং প্রতিরোধ এখন একসঙ্গে চালাতে হবে। প্রতিকার হিসেবে আমরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করতে পারিঃ
১. পারিবারিক শিক্ষার ভিত মজবুত করণ
২. নৈতিক শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান ও ধর্মীয় অনুশাসন মজবুত করা
৩. নারী-পুরুষের বোঝাপড়া সুদৃঢ় করতে শিশুকাল থেকে ছেলে-মেয়ের যৌথশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু
৪. ছেলেদের ক্রীয়ামুখী করা
৫. শিক্ষাকে মুখস্থধর্মী না করে সৃজনশীল করা
৬. মাদকের সহজলভ্যতা দূর করা
৭. মেয়েদের প্রাইমারী থেকে আত্মরক্ষার শিক্ষা দান
৮. একটা খুনের জন্য যেমন খুনিই দায়ী, কোনো কিছু দিয়ে যেমন এটাকে জায়েজ করা চলে না; তেমনি ধর্ষণের জন্য শুধু ধর্ষকই দায়ী- এই মানসিকতা গড়ে তোলা
৯. পরিবারের মান-সম্মানের দায় কেবল মেয়ে নয় সমানভাবে ছেলের ওপরেও বর্তাবে, এমন মানসিকার বিকাশ ঘটানো
১০. যৌনতা অবশ্যই অপরিহার্য; কিন্তু পুরুষদের জন্য এই প্রয়োজনকে অতিরিক্ত আসক্তি বা বিনোদনের বিষয় করে না তোলা

অনুরূপভাবে প্রতিরোধ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকেঃ
১. কিছু কিছু সিস্টেমের পরিবর্তন করা
২. ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ এবং দ্রুত কার্যকরী আইন চালু করা এবং আইনের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা
৩. জিরো টলারেন্স, জিরো টলারেন্স এবং জিরো টলারেন্স- ধর্ষণের বিরুদ্ধে সর্বস্তরে এই নীতি মেনে চলা
৪. ধর্ষণের শিকার নারীরা যাতে ধর্ষকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে সামাজিক এবং প্রশাসনিকভাবে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
৫. প্রয়োজনে প্রতিটা থানায় নারী পুলিশের সেল গঠন করা, পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক বিভাগ অত্যাধুনিক করা এবং সেখানে নারী ডাক্তারের ব্যবস্থা করা
৬. ধর্ষকের জন্য আইনি লড়াইয়ে আইনজীবীদের অংশগ্রহণ না করা
৭. ধর্ষণের অন্যতম একটি কারণ রাজনৈতিক। ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতা ও কর্মীদের আরো দায়িত্বশীল হওয়া। অপরাধী হলে আইনগতভাবে তাদের ছাড় না দেওয়া।
৮. যৌনতার দিক দিয়ে কোনো পুরুষের মানসিক বিকৃতি ঘটলে পরিবারকে এগিয়ে আসা; প্রয়োজনে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা
৯. ছেলের আচার-আচরণকে অগ্রাহ্য করে মেয়ের চালচলন পোশাক নিয়ে কথা বলার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা

এখনই যদি আমরা সমাজ এবং প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে প্রতিকার এবং প্রতিরোধ না গড়ে তুলতে পারি, তাহলে ধর্ষণের ঘটনা আরো বেড়ে যাবে- একটা সময় হয় আমরা প্রত্যেকে নিজেদের ধর্ষকের পরিবারের নতুবা ধর্ষণের শিকার নারীর পরিবারের সদস্য হিসেবে আবিষ্কার করবো। সেই দিনটি আসতে কি খুব বেশি দিন বাকি আছে? বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে প্রায় দেড় হাজার ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এটা মাত্র চার মাসের হিসাব। তাও যেগুলো পত্র-পত্রিকায় এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, গত বছর দেশে ৩ হাজার ৬৪৮ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। এর বাইরে আরো অনেক ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে- প্রভাবশালী মহল জোর করে দমিয়ে দিয়েছে অথবা পরিস্থিতি বিবেচনায় ধর্ষণের শিকার নারী স্বেচ্ছায় সরে গেছে। এর কোনোটাই কাঙ্খিত চিত্র না।

- মোজাফ্ফর হোসেন