সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / তিন তালাক ও আজকের নারীসমাজ
০৯/২৮/২০১৭

তিন তালাক ও আজকের নারীসমাজ

-

এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক- শব্দগুলো মনের ভাব প্রকাশের কোনো মাধ্যম নয়, নয় কোনো ধর্মীয় আপ্তবাক্য। পুরষের কণ্ঠনিঃসৃত এই বর্ণমালাগুলো এক হয়ে বরং এক শেকল তৈরি করে, যা একেবারে অনৈতিকভাবে বেঁধে ফেলে একজন নারীকে। আর এই শেকল ভেঙে বেরিয়ে আসতে মাঝে মাঝে এক জীবনও শেষ হয়ে যায়। তিন তালাকের এই শেকল ভাঙার ডাক এসেছে এবার। এ-ডাক পৌঁছে গিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।

ভারতে তিন তালাকপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা

বলছিলাম, ভারতে তিন তালাকপ্রথা নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে। সম্প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির রায়ে তিন তালাকপ্রথা ‘অসাংবিধানিক’ বলে ঘোষণা করেছেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। ভারত, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নিগৃহীত নারীসমাজের জন্য এ ঘটনা এক কথায় ঐতিহাসিক বলা চলে। তবে তিন তালাক প্রথাটাকে শুধুমাত্র সংবিধানবহির্ভূত বললে ধর্মের নামে চরম অধর্ম পালনকারীরা ভ্রু-কুঁচকাবে অথবা নাকের ডগায় তাদের রাগ চলে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তাই এই তিন তালাকপ্রথা ইসলামের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় বলে রায় দিয়েছেন। সাম্প্রতিক রাম রহিম প্রসঙ্গ টেনে আনলেই বোঝা যায়, ধর্মীয়ভাবে একেবারে গম্ভীর ও একইসঙ্গে অসহিষ্ণু একটি দেশে বহু বছর ধরে প্রচলিত এই কুপ্রথা বাতিলের পথটা কোনোভাবেই মসৃণ ছিল না। তবে ব্যাপারটিকে নেহাত সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় ভাবলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে ভারতবর্ষে নিপীড়িত হাজারো নারীর আর্তনাদ, বুক-চাপা কষ্ট এবং শত বছর ধরে চলা অন্যায়ের প্রতি জমা বিন্দু বিন্দু ক্ষোভ। সেই বিন্দু বিন্দু ক্ষোভ সিন্ধু হয়ে যখন সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছেছে তখন বিচারকদের সমগ্র বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও সমাধান করা ছাড়া উপায় ছিল না। বিগত বছরগুলোতে সায়রা বানো, গুলশান পারভিন, ইশরাত জাহান, আতিয়া সাবরিসহ নাম না-জানা অনেক নারী তিন তালাকের বিচার চেয়ে পৃথক মামলা দায়ের করেন দেশটির সুপ্রিম কোর্টে। এর সঙ্গে যোগ হয় নারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিন তালাক বাতিলের পক্ষে বলিষ্ঠ জনমত। বিগত বছরগুলোতে নারীদের করা মামলা ও এর নেপথ্যের ঘটনা বিশ্লেষণ করে এই প্রথাটিকে সংবিধান বহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হয় এবং এরই মধ্য দিয়ে ভারতে তিনতালাক প্রথা একেবারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের জন্য এই রায় কিছুটা হলেও সুদিনের আশ্বাস নিয়ে এসেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আশ্বাসের ধ্বনি ভারতের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে গিয়েছে।

তিন তালাক ও বাংলাদেশ

যুগ যুগ ধরে আবহমান বাংলার অজস্র নারীর জীবন চিরতরে শেষ করে দিয়েছে এই তিনতালাক। কারণে-অকারণে, নিজের চাহিদা মেটাতে কিংবা যৌতুকের লোভে যখন ইচ্ছে মুখে তিন তালাক উচ্চারণ করে নারীকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে পুরুষসমাজ। স্বামী-পরিত্যক্তা নারীকে সুন্দরভাবে বাঁচার আর সুযোগ দেয়নি আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা, ঘরের এককোণে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মতো বাকি জীবন পার করেছেন অনেকেই। ডিজিটাল বাংলার ঘরে ঘরে এখন আলো এসেছে, শিক্ষা-প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবন হয়েছে আরো আধুনিক। তবে ভালো করে কান পাতলে এখনো দেশের কোনো এককোণে তিনতালাকের শিকার অসহায় নারীর কান্না শোনা যাবে। না, তিন তালাক উচ্চারণের মাধ্যমে বিবাহ-বিচ্ছেদ বাংলাদেশ আইনত বৈধ নয়। তবে এর মাধ্যমে কেউ বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলে তাকে শাস্তি দেয়ারও সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। আইনগতভাবে এই বিচ্ছেদ কার্যকরী না। আবার আইনগতভাবে তালাক পেলেও স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে একজন বাংলাদেশি নারীর। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসবই কাগজপত্রের হিসেব, বাস্তবে তার কতটুকু মেনে চলা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই যথাযথ আইন থাকলেও তা কার্যকর করা ছাড়া এদেশে তিনতালাকের হাত থেকে নারীর মুক্তি পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাবে না বলা চলে। তাছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভারতের মতো বাংলাদেশের আদালতেও এ ধরনের মামলার সংখ্যা নেহাত কম নয়। তার সুষ্ঠু সমাধান এবং আইনের সঠিক প্রয়োগের সময় তাই এখনই।

তিন তালাকের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তার মূলভাবটুকু ছড়িয়ে যাক বিশ্বের সর্বত্র। তিন তালাকের মতো কুপ্রথা, ধর্মের অপব্যাখ্যা ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের স্বেচ্ছাচারিতা ও নারীর প্রতি নেমে আসা প্রতিটি অন্যায় নিষিদ্ধ হোক। শেকল ভাঙার গান বেজে উঠুক প্রতিটি মানবমনে।

- নাইব রিদোয়ান