সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / সবার উপরে কি মানুষ সত্য নয়?
০৯/১৬/২০১৭

সবার উপরে কি মানুষ সত্য নয়?

-

বাতাসে জমতে শুরু করেছে মনমাতানো শারদীয় ঘ্রাণ। কিন্তু আমরা ভালো নেই। তার কারণ অনেক। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের মেয়ে রূপা বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাবার পথে বীভৎস ধর্ষণের শিকার হয় বাসের মধ্যে। ধর্ষক বাসের চালক ও হেলপাররা এক পর্যায়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে ঘাড় মটকে হত্যা করে রূপাকে। ঘটনার অতি নৃশংস বিবরণ প্রকাশ হওয়ার পর ভাবতে বিস্ময় জাগে- আমরা নাকি সৃষ্টির সেরা জীব!

রূপার মতো এদেশের লাখ লাখ নারী বিশ্বাস করে- আমাদের সমাজ অগ্রসর হয়েছে, নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে। সেই বিশ্বাস থেকেই জীবিকার প্রয়োজনে একা বের হতে সাহস করেছিল রূপা। কিন্তু রূপার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো চাপ চাপ অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে।। দুঃখের বিষয় হলো, এই ভয়াবহ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘিরে দেশজুড়ে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠিছিল, তা দানা বাঁধতে না-বাঁধতেই যেন থিতিয়ে গেল! নতুন ইস্যু হিসেবে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় হচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রতি নৃশংসতা। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে গতমাসে সে দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পরে গোটা পরিস্থিতি নতুন করে জটিল রূপ ধারণ করেছে। ডিঙিতে করে অশান্ত সমুদ্র এবং দুস্তর নাফ নদী পেরিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ঢোকার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। নাফ নদীতে নৌকাডুবি হয়ে রোহিঙ্গাদের মৃত্যু ঘটছে প্রায় প্রতিনিয়ত। তার মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা কম নয়।

মিয়ানমারে যা চলছে তা এক কথায়-এথনিক ক্লিনজিং। অর্থাৎ জাতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে চায় মিয়ানমার। এই পরিস্থিতি সামলানো না গেলে সেখানেও রোয়ান্ডা, দার্ফুর, বসনিয়া বা কসোভোর মতো ‘গণহত্যা’ অবধারিত। দুঃখের বিষয় হলো, শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি সবাইকে বিস্মিত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পাশেই দাঁড়িয়েছেন! এদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা শাঁখের করাতের মতো। বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় দেওয়ার অর্থ মিয়ানমারের উদ্দেশ্যকেই হাসিল করা। তারা চায় রোহিঙ্গারা দেশছাড়া হোক। আবার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় না দিলে পদদলিত হবে মানবতা। গণহত্যার ঘটনা সম্প্রসারিত হবে মিয়ানমারে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, রোহিঙ্গাদের নিয়ে তিন দশক ধরে বাংলাদেশে চলছে নানা ধরনের রাজনৈতিক খেলা। এমন কী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাদের নিজ নিজ হিসেব-নিকেশ অনুযায়ী খেলছে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে। আর এসবের ভেতরে নীরবে কাঁদছে মানবতা। সবাই যেন ভুলতে বসেছে মানবতার মহান বাণী-‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ রোহিঙ্গারা যেন মানুষই নয়!

শরৎ এসেছে। এই সময় প্রতিবছর শুরু হয় বাঙালি হিন্দুসম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পৌরাণিক তত্ত্ব অনুযায়ী দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসেন অসুরকে বধ করতে। মানুষের মনের ভেতরেও বাস করে সুপ্ত অসুর। সেই অসুরকে বধ করার প্রতীকীরূপ হিসেবেই এই উৎসবকে কল্পনা করা যায়। শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- জগতের সম্মিলিত শুভশক্তি পুঞ্জিভূত হয়েছে এক নারীর মধ্যে। সেই নারীই জগৎকে রক্ষা করছে অশুভ শক্তির রোষানল থেকে।

সকল ধর্মই শান্তির কথা বলে, অশুভশক্তি বিনাশের কথা বলে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক ধর্ম ইসলাম হলো শান্তির অপর নাম। সীমা লঙ্ঘন করা ও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারেও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে ইসলাম ধর্মে। ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যও একটি দেশের বড় সম্পদ। অনন্যা সেই বৈচিত্র্যকে সম্মান করে। সেই সম্মানের অর্ঘ্য এবারের এই শারদীয় সংখ্যা।

জয় হোক শুভশক্তির। সবাইকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা।

- তাসমিমা হোসেন