শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিনোদন / ভাবনায় ভয়ঙ্কর সুন্দর
০৯/১৩/২০১৭

ভাবনায় ভয়ঙ্কর সুন্দর

-

ছবির নাম ভয়ঙ্কর সুন্দর। কৌতূহলটা এখানেই- ‘সুন্দর’ কিভাবে ‘ভয়ংকর’ হয়! গত ৪ আগস্ট দেশব্যাপী ২৮টি পেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তির পর থেকে এ নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা দুই-ই হচ্ছে। যারা অন্যের কাছ থেকে শুনে ছবি দেখতে যান তারা পড়েছেন বিপাকে, কেউ বলেছেন চলচ্চিত্রের নামে বড় একটা নাটক বানিয়েছেন অনিমেষ আইচ, কেউ মন্তব্য করেছেন, অনেকদিন পর সুন্দর গল্পের গাঁথুনি খুঁজে পাওয়া গেল ভয়ংকর সুন্দরের মাঝে। এখন কোন দিকে যাবেন সাধারণ দর্শক? প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বুঝতে হবে, ভয়ংকর সুন্দর আসলে কোন ধরনের চলচ্চিত্র। পরিচালকের ভাষায় এটি একটি বাংলাদেশি নাট্য-চলচ্চিত্র। এখন কেউ যদি এখানে পূর্ণ-বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের আবহ খোঁজেন, তাহলে হতাশ হবেন। কারণ নাট্য-চলচ্চিত্রে বাস্তবতার নিরীক্ষে গল্পের গাঁথুনিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। এই জায়গাটায় ভয়ংকর সুন্দর পুরোপুরি একটা সফল ছবি। প্রেক্ষাগৃহে বসে যদি কেউ আমাদের আশপাশে ঘটে যাওয়া কিছু বিষয়ের মিল খুঁজেন তবে অনেক কিছুই পাবেন।

শ্রাবণ চলছে। হুটহাট বৃষ্টি হচ্ছে, পানি জমছে। বৃষ্টি না নামলে বুক ফাটছে গরমে। ছবির গল্পে এ নিয়ে বার্তাও আছে। এই কারণেই কি ছবি মুক্তির জন্য এই সময়টাকেই বেছে নিলেন পরিচালক? অনিমেষ আইচ উত্তর দিলেন, এখন অন্য ছবির দৌড়ঝাঁপ নেই, রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। এ সময়টাই আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে।

অনিমেষের কাজের সাথে পরিচয় আছে দর্শকদের। ছোটপর্দায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন তিনি। এটি তাঁর তৃতীয় ছবি। অবশ্য আলোর মুখ দেখেনি একটি। তাঁর আগের কাজগুলো বিশ্লেষণ করে বলা যায়, কাজের ব্যাপারে অনিমেষ খুঁতখুঁতে। নতুন কাজ নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট, প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘কাজটা ভালো হয়েছে। আমি আশাবাদী।’

একটি গল্পকে অবলম্বন করলেও ছবির চরিত্রগুলো নতুন করে সাজিয়েছেন পরিচালক। বললেন, ‘প্রেম ও সামাজিকতার গল্পের ভেতর দিয়ে পৃথিবীতে মিষ্টি পানির সংকটকে ছুঁয়ে যেতে চেয়েছি। ল্যাপটপ বা মোবাইলে ছবিটা দেখলে মজা পাওয়া যাবে না। বড় পর্দায় দেখতে হবে।’

ছবির শুরুতেই দেখা যায়, নয়নতারা (ভাবনা) বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকা এসেছে। সে বেশ বনেদি ও ধনাঢ্য ঘরের সন্তান। সদরঘাটে নেমে সে উদ্দেশ্যহীন রিকশায় ঘুরছে। একসময় রিকশাওয়ালার সাহায্যে সে পুরান ঢাকার একটি হোটেলে রুম পায়। নয়নতারার রুম-সার্ভিস যে ছেলেটা তার ডাকনাম মুকু (পরমব্রত)। নয়নতারা পালানোর সময় বেশকিছু টাকাপয়সা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে এসেছে। সে মুকুকে ভালো খাবার আনতে পাঠায়, মুকু নিয়েও আসে কিন্তু নয়নতারা তা খেতে পারে না। কারণ নয়নতারার আভিজাত্য অনুযায়ী খাবার আনার কথা কোনো পাঁচতারকা হোটেল থেকে। নয়নতারা, ধনীর আদরে সন্তান হিসেবে যা হয় তাই; আহ্লাদি, বস্তবতা-বিষয়ক জ্ঞান কম এবং একটু জেদিও বটে। মুকু অতি সাধারণ সহজ-সরল, বোকা ও ভীরু প্রকৃতির মানুষ। যার বাবা-মা কারো স্মৃতিই মনে নেই, অনাদরে অযত্নে কাকার কাছে মানুষ। একপর্যায়ে নয়নতারার সাথে মুকুর কিছুটা বন্ধুত্ব হয়। ধনী ঘরের সন্তানেরা সাধারণত এটা দাও, এটা আন, ওটা আন এ ধরনের বলার মতো প্রচুর মানুষ আশেপাশে পায়। কিন্তু নয়নতারা এই শহরে পালিয়ে আসার পর তার একাকিত্বের সময় সেই সার্ভিসটুকু পাচ্ছিলো মুকুর থেকে। ওদিকে একদিন কিছু কেনাকাটা করে ফেরার পথে পাড়ার মাস্তানের চোখ পড়ে নয়নতারার উপর। মুকুকে বের করে দিয়ে নয়নতারার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে, সেই ভিতুর ডিম মুকু ফুলদানি দিয়ে মাথায় আঘাত করে মাস্তানকে মেরে ফেলে। ফলাফল দুজনেই পালিয়ে যায় হোটেল ছেড়ে। এই যে মুকু পরিস্থিতির কারণে খুন করে ফেলল পাড়ার প্রভাবশালী মাস্তানকে, গতানুগতিক ছবি হলে কিন্তু তারপর মুকু হয়ে যেতো এলাকার ডন বা এ জাতীয় কিছু। ভয়ংকর সুন্দরে তা কিন্তু হয়নি। এখানে আমরা নায়ক-নায়িকাকে অতিপ্রাকৃতভাবে উপস্থাপনের যে চেষ্টা চলচ্চিত্রের সংস্কৃতি হয়ে দেখা দিয়েছে তার থেকে মুক্তি পেলাম।

ভাবনা এবং পরমব্রত সত্যিকার অর্থেই এ চলচ্চিত্রে নয়নতারা ও মুকু হতে পেরেছিলেন। এটাও বড় একটা সাফল্য। এরপর সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়ে নয়নতারা ও মুকু বস্তিতে ঘর ভাড়া নেয়। মুকু কোনো এক হোটেলে ক্লিনিং সার্ভিসে চাকরিও নিয়ে নেয়। কিন্তু বস্তির লোকজন তাদের ভালোভাবে নেয় না। নিম্নবিত্ত শ্রেণির আরেকটি বাস্তবরূপ আমরা ভয়ঙ্কর সুন্দরে দেখতে পাই। নয়নতারার পোশাক, লাইফস্টাইল তারা মেনে নিতে পারে না। এদিকে এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধের কারণে নয়নতারা পানির জন্য হাহাকার করে। প্রতিবেশি বস্তিতে পানি আনতে গিয়ে বস্তিবাসির আক্রোশ ও হামলার শিকার হয়। আসলে আমরা সাধারণত নিম্নবিত্তকে যে চোখে দেখি উচ্চবিত্তকে অন্য চোখে দেখি। কিন্তু আমাদের এ দেখা অনেকাংশে সঠিক নয়। নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মতোই তাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন মানুষকে প্রতিপক্ষভাবে ভয়ংকরভাবে। সেই সাথে হঠাৎ উপরতলা থেকে পরিস্থিতির কারণে নিচতলায় নেমে গেলে নিচতলার মানুষগুলোর আচরণ যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা আসলে বাস্তবে যে এ-ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েন নাই তিনি বুঝবেন না। সেই ব্যপারটাই সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পেরেছে ছবিটি।

এরপর নয়নতারা একধরনের মানসিক অস্থিরতায় পড়ে যায়। সে তার স্বর্ণালংকার বিক্রি করে শত শত বালতি মগ, ড্রাম কিনে সেখানে পানি জমাতে শুরু করে। মুকু ও নয়নতারা অপেক্ষা করে সেদিনের যেদিন আবার পানি সরবরাহ বন্ধ হবে সবাই তার কাছে আসবে পানি চাইতে। সেদিন সত্যি আসে। নয়নতারা ও মুকু এক ধরনের উন্মাসিক আনন্দ পায়। কিন্তু দিন শেষে বস্তিবাসি পানির জন্য চওড়া হয় বাড়িওয়ালির উপর। আমরা আগেই দেখেছি বাড়িওয়ালিই মূলত এখানে মুখ্য চরিত্র, বাড়িওয়ালা ফারুক আহমেদ মাতাল। বস্তিবাসি পয়সা দিয়ে ওয়াসার পানি আনার দাবি জানায়। কিন্তু বাড়িওয়ালা কৌশলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ও ভাড়াটিয়াদের আসন্ন বিক্ষোভ থেকে বাঁচতে ঘোষণা দেয়, নয়নতারা ও মুকুর সংসারে ধরে রাখা পানিতে সবার অধিকার আছে। বস্তিবাসীকে সাথে নিয়ে নয়নতারার ঘরের দরজা ভেঙে যে-যার মতো পানি নিতে থাকে। নয়নতারা ও মুকু প্রথমে বাঁধা দিলেও আস্তে আস্তে তারা বিষয়টি উপভোগ করতে থাকে।

এখানে চিন্তা অবকাশ আছে, এক ফোঁটা পানির জন্য নয়নতারা রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়েছিল, কেউ তাকে একগ্লাস পানি দেয়নি, দিন শেষে সে অনেক পানি অনেক পরিশ্রমে জমা করলো আর তখন মানুষ লুট করে নিয়ে যেতে লাগল। বিষয়টি ভয়ংকর কিন্তু মানবিক চোখে যখন নয়নতারা ও মুকু তাকালো তখন সুন্দর হয়ে উঠল এ ভয়ংকর দৃশ্যও।

এই হলো মোটামুটি গল্প। একটু খেয়াল করে দেখুন, শেষদিকে বাড়িওয়ালার চরিত্রের সাথে কি রাজনৈতিক কোন গন্ধ পান? এই চলচ্চিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নারীপ্রধান চরিত্র। এখানে থেকে কি চলচ্চিত্রটি আরেকটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়? নয়নতারা ও মুকু এক ধর্মের নয়। তারা দুজন বিয়ে করে আইনের আশ্রয়ে। এখান থেকে কি কোনো ম্যাসেজ পাচ্ছেন? সাধারণ চোখে দেখলে একটা প্রেমের গল্প আর পানির জন্য হা-হুতাশ ছাড়া হয়তো কিছুই চোখে পড়বে না। কিন্তু এ ছবি ভয়ংকর কিছু বিষয় খুব আলগোছে আমাদের হাতে দিয়ে গেলো।

ভাবনা বলেন, ‘আমি এমন একটি ছবির জন্যই এতদিন অপেক্ষা করেছিলাম। সেটি পেয়েও গিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘উপমহাদেশের বেশিরভাগ ছবিই নায়কশাসিত। কিন্তু ‘ভয়ংকর সুন্দর’ এমনই একটি গল্প, যেখানে নায়ক বা নায়িকা নয়, বরং চরিত্রগুলো গুরুত্ব পেয়েছে।’ নিজের চরিত্র প্রসঙ্গে বললেন, ‘নয়নতারা চরিত্রটা এতটাই লোভনীয় ছিল যে, শুটিংয়ের আগে-পরে দেড় বছর কোনো কাজ করিনি। পরিচালকের বারণ ছিল না। আমি নিজেই করিনি। প্রতিদিন একটু একটু করে নয়নতারা হয়ে উঠতে, তার মতো জীবনযাপন করতে বেশ লাগছিল।’

- আলমগীর কবির