রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / বখতিয়ারের ডায়োজিনিস
০৮/৩১/২০১৭

বখতিয়ারের ডায়োজিনিস

- আহসান হাবীব

এই নিয়ে বখতিয়ার সাহেব চারবার দলবদল করেছেন। তবে এবারের দলবদলটা ঠিকঠাক কাজে লেগেছে। যাকে বলে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। ক্ষমতাসিন দলে থাকা মানেইতো চাঁদাবাজী টেন্ডার... টু পাইস। প্রথম দানেই সোয়া কোটি টাকা সরিয়ে ফেলতে পেরেছেন। বাধ মেরামতের জন্য চৌদ্দ কোটি টাকা এসেছিল। টাকা এসেছিল ইউএনও বরাবর কিন্তু কায়দা করে সেখান থেকে সোয়াকোটি টাকা বের করে নিজের একাউন্টে ঢুকিয়ে ফেলা সোজা ব্যাপার না।

সেই শুরু... আজ তিন বছরে একাউন্ট ফুলেফেঁপে। যাকে বলে এক কথায় আঙুল ফুলে কলাগাছ। না ভুল বললাম আঙুল ফুলে বটগাছ।
ঢাকায় দুটো ফ্ল্যাট কিনেছেন। একটা গুলশানে একটা বনানীতে। জমি রেখেছেন উত্তরায়। গাড়িতো আপাতত দুটা আছেই। পাজেরোটা ঢাকাতেই রেখেছেন। এলাকায় আনলে কথা উঠতে পারে। দরকার কি? এর চেয়ে কম দামি টয়োটা এক্সিওটা নিয়ে এলাকায় যান মাঝে মাঝে।

ইদানীং বখতিয়ার সাহেবের কেন যেন নিজেকে আলেকজেন্ডার দি গ্রেট বলে মনে হচ্ছে। আলেকজেন্ডার যেমন সিংহাসনে বসেই চারদিকে জয় করতে লাগলেন একের পর এক, তারও অবস্থা অনেকটা তাই। যেখানেই হাত দিচ্ছেন সাফল্য টাকা সম্মান। তিনি যেন সেই ভিনি ভিডি ভিসি... শব্দটা যেন কি আলেকজেন্ডর তো বলেছিলেন বোধহয়। এলাম দেখলাম আর জয় করলাম। বখতিয়ার সাহেব ইতিহাসে বিএ পাস করেছেন (অনেকে অবশ্য সন্দেহ করে) বলে ইতিহাসটা ভালো জানা আছে বিশেষ করে আলেকজেন্ডারের অংশটা। সেই সূত্রে দার্শনিক ডায়োজিনিসের কথাও তার বেশ মনে আছে।
একবারতো পার্টির মিটিংয়ে যখন সবাই তার প্রশংসা করছিল। তখন তিনি একফাঁকে বলেই বসলেন,
- মিয়া আমার এলাকা যদি একজন ডায়োজিনিস থাকত দেখতা এলাকার উন্নয়ন কি করতাম... মায়রে বাপ।
- ডায়োজিনিস কে স্যার? একজন ফিস ফিস করে জানতে চায়।

ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হন বখতিয়ার। এরা ডায়োজিনিস নাম শুনেনি এরা কি রাজনীতি করবে। অথচ আলেকজেন্ডারের মতো লোক ডায়োজিনিসের কাছে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে থাকতেন... পরামর্শ নিতেন কথা বলতেন। যে ডায়োজিনিস কিনা থাকত একটা ভাঙা মদের পিপের ভিতরে। তার সম্পত্তি বলতে ছিল একটা লন্ঠন আর লাঠি... আফসোস এই এলাকায় ডায়োজিনিসের মতো একটা লোক নেই যার সাথে রাজনীতি নিয়ে পরামর্শ করা যায়, কথাবার্তা বলা যায়। ভিতরে ভিতরে তিনি সত্যিই আফসোস করেন। মিটিংয়ের মধ্যেই তিনি ডায়োজিনিস নিয়ে হালকা বক্তৃতা দেন। ডায়োজিনিসের সততা নিয়ে বলতে গিয়ে তার গলা ধরে আসে। উপস্থিত নেতা উপনেতা পাতি নেতা কমবেশি সবাই চোখের পানি ফেলে দেয়, এমন অবস্থা যেন।

বখতিয়ার সাহেব একফাঁকে সেই গল্পটাও বলে ফেলেন সেই যে আলেকজেন্ডার ডায়োজিনিসের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
- কি চান আপনি আমার কাছে ? জবাবে ডায়োজিনিস বললেন
- সরে দাঁড়াও যেটা তুমি দিতে পারবে না, সেটা আটকাচ্ছ কেন? অর্থাৎ আলেকজেন্ডার শীতের দিনে তার সামনে দাঁড়িয়ে রোদ আটকে দিয়েছিলেন। মিটিংয়ে সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল গল্প শুনে। এই না হলে আলেকজেন্ডার ? এই না হলে ডায়োজিনিস ? বখতিয়ার ??

একদিন বখতিয়ারের দলের এক পাতি নেতা এসে ফিস ফিস করে বলল,
- স্যার পাওয়া গেছে।
- কি পাওয়া গেছে?
- জিনিস।
- জিনিস মানে?
- মানে ঐ যে আপনি বলছিলেন ডাইজিনিস
- ডাইজিনিস না... ডায়োজিনিস?
- জি জি একদম ঐ কাটিং একটা ভাঙা পাইপে ভিতর থাকে সাথে একটা লাঠি আর হ্যারিকেন!
বলে কি! ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠেন বখতিয়ার। হতেও তো পারে হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ। শত শত বছর পর আবার ডায়োজিনিস ফিরে এসেছেন তার এলাকায়।

আর দেরি করলেন না বখতিয়ার। তখন তখনই গাড়ি নিয়ে রওনা হলেন। সঙ্গে চলল দু’একজন ছোট বড় পাতি নেতা। গিয়ে দেখেন সত্যিই যেন সেই ডায়োজিনিস (ইতিহাসের বইয়ে ছবি যেমন দেখেছিলেন) মুখে কাঁচা-পাকা লম্বা দাড়ি। গায়ে কাপড়চোপড় ঠিক নাই। একটা ভাঙা পাইপের ভিতর বসে আছে এক বৃদ্ধ। পাশে একটা হ্যারিকেন আর লাঠি। যেমনটা ডায়োজিনিসের ছিল। গাড়ি থেকে নেমে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন বখতিয়ার সাহেব। নিজেকে সত্যি সত্যিই আলেকজেন্ডার মনে হচ্ছিল। তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন,
- কি চান আমার কাছে?

ডায়োজিনিস চোখ তুলে তাকালেন। তারপর বললেন,
- একপাটি জুতা
- জুতা? তাও একপাটি। ভিতরে ভিতরে হতাশ হন বখতিয়ার এ তো ডায়োজিনিসের মতো কথা হলো না।
- জুতা দিয়ে কি হবে?
- ক্যান তোমারে জুতা পিটা করতাম... চোরার ঘরে চোরা!

এরপরের এলাকার উন্নয়নে প্রথম যে কাজে হাত দেন বখতিয়ার সেটা হচ্ছে এলাকার পাগল ফকির ভবঘুরে সব উৎখাত করা। এই কাজে সত্যিই তিনি ভালো সাফল্য দেখিয়েছেন। তার এলাকা এখন ভিক্ষুক ভবঘুরে ও পাগলমুক্ত !