রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / একজন কাজী মাকসুদাঃ আমাদের ওয়ান্ডার ওম্যান
০৮/১৭/২০১৭

একজন কাজী মাকসুদাঃ আমাদের ওয়ান্ডার ওম্যান

-

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ওয়ান্ডার ওম্যান মুভি দেখেছেন বা অন্তত নাম শুনেছেন তো? মুভিটিতে সুপার পাওয়ার সমৃদ্ধ এক নারী একের পর এক অ্যাকশনের মাধ্যমে বধ করে চলেছেন শত্রুপক্ষকে। তবে বাস্তবে এমন ওয়ান্ডার ওম্যান আদৌ কি আছে? পাঠক হতাশ হবেন না, সুপার-ন্যাচারাল না হোক, রক্তমাংসের এক বাংলাদেশি ওয়ান্ডার ওম্যানের গল্প শোনাব আজ।

বিসিএস ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) কাজী মাকসুদা তখন মাত্র কয়েকদিন আগে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। দিনটা ছিল ২৪, সেপ্টেম্বর ২০১৫। দুপুরবেলা খবর এল ঢাকার দক্ষিণে কেরানীগঞ্জের কদমতলায় একটি বাসায় একজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন মাকসুদা। ঘরের খাটের নিচ থেকে আরো এক নারী ও দুই শিশুর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেল। কিন্তু খুনের কারণ তখনো অজানা। সারা ঘর খুঁজেও প্রাথমিকভাবে কোনো প্রমাণ বা আলামত পাওয়া গেল না। অবাক করা হলেও সত্যি যে বাড়ির মালিক কিংবা পাড়া প্রতিবেশিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও প্রকৃত পরিচয় জানা গেল না। এমন অবস্থায় এই মামলার তদারকির ভার দেয়া হলো মাকসুদাকেই।

সারা ঘর আবারো তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখার ব্যবস্থা করলেন মাকসুদা। এবার এক কোণা থেকে ছেঁড়া চার টুকরো কাগজ মিললো, যা জোড়া লাগিয়ে দেখা গেল তা কেরানীগঞ্জ ট্রাক সমিতির পরিচয়পত্র, খুন হওয়া পুরুষের নাম সাজু। এরপরই খোঁজখবরের মাধ্যমে বেরিয়ে এল নিহতরা হলেন পঞ্চগড়ের- সাজু আহমেদ (৩৫), তার স্ত্রী রাজিয়া বেগম (২৬), ছেলে ইমরান (৫) এবং মেয়ে সানজিদা (৩)। তবে খুনের কারণ তখনো অজানা। তবে আশার বিষয় হলো এসব তথ্যই লাশ পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বের করে এনেছেন মাকসুদা, খুনিরা তাই বেশি দূর পালাতে পারেনি তখনো।

এবার আরো তৎপর হলেন মাকসুদা। একেবারে চিরুনি অভিযান চালিয়ে বের করে আনলেন যে মৃত সাজু আহমেদ ট্রাক চালানো ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগেই, ট্রাক ছেড়ে সিএনজি চালানো শুরু করেছিলেন। সিএনজি স্ট্যান্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেল সাজু মূলত একটি সিএনজি ডাকাত চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে তথ্য পেয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে মুন্সিগঞ্জের সুমনকে আটক করে জানা গেল খুনির সঙ্গে তারা পাঁচজন মিলে খুন করেছেন। সুমনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ডাকাত দলকে ধরতে পাবনার গেলেন মাকসুদা। কিন্তু সেখানে হলো নতুন বিপত্তি। ডাকাত দল ঠিক যে জায়গায় পালিয়ে আছে তাতে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার জো নেই। অগত্যা দলবল রেখে মাত্র পাঁচজনের টিম নিয়ে নৌকায় করেই রওনা হলেন মাকসুদা। এরপর টানা তিনদিন পাবনার বেড়ায় একের পর এক অভিযান চালানোর পর চতুর্থ দিনে ডাকাত দল ধরা পড়লো। এই চারদিন এক মুহূর্তের জন্যও দায়িত্ব থেকে দূরে থাকেননি মাকসুদা। তিনি জানতেন অল্প কিছু মুহূর্তের দেরিতেই ডাকাত দল ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। মাকসুদার চৌকস নেতৃত্ব, দায়িত্বের প্রতি সততা এবং হার না মানা মানসিকতার কারণে মাত্র চার-পাঁচদিনের মধ্যেই পুরো ডাকাত দল গ্রেপ্তার হয়, যাদের মধ্যে পরে চারজনের ফাঁসি ও একজনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়।

মাকসুদার জীবনে এমন সাহসী পদক্ষেপ যে এটিই একমাত্র তা কিন্তু নয়। বছর দুয়েক আগে কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে অপরাধীর হাত থেকে নিজের সহকর্মীদের এক দুধর্ষ অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করেন তিনি। এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে গেল বছর মাকসুদা পেয়েছেন ‘বাংলাদেশ উইমেন পুলিশ অ্যাওয়ার্ড’। আমাদের দেশে যেখানে বছরের পর বছর গেলেও খুনের বিচার হয় না, বরং খুনি উপরিমহলের ছত্রচ্ছায়ায় দিন পার করে সেখানে মাকসুদা স্থাপন করেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেলুলয়েডের সুপার কপ বা ওয়ান্ডার ওম্যান-এর চেয়ে তা কোনো অংশে কম কি?

- নাইব রিদোয়ান