রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিবিধ / ‘মুনাটিক’ -- বাংলাদেশি এক নারীর ইন্টারনেট কমেডি তারকা হয়ে ওঠা
০৮/০৯/২০১৭

‘মুনাটিক’ -- বাংলাদেশি এক নারীর ইন্টারনেট কমেডি তারকা হয়ে ওঠা

- আনুশে হোসেন

আমাদের সমাজে মেয়েদের কৌতুক অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া, কিংবা হাস্যরস বা প্রহসনের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলা কোনো সহজ বিষয় নয়। আমেরিকায় বেশ কয়কজন জনপ্রিয় নারী কৌতুকাভিনেতা রয়েছেন, যাদের মধ্যে টিনা ফে, চেলসি হ্যান্ডলার, এমি শুমার ইত্যাদি আরও অনেকে উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমে নারীদের হাস্যরসের জগতে অবদান থাকলেও, অনেকে মেনে নিতে চান না যে, নারীও পুরুষের মতো হাস্যরসের মানুষ হতে পারে।
নারীর কৌতুকাভিনেতা হয়ে ওঠা আরও কঠিন, যখন সেই নারী বেড়ে ওঠে একটি রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে।

তাই সৌদি আরবে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি ফারহানা মুনার ইউটিউবে তারকা হয়ে ওঠা কোনো ছোট বিষয় নয়। মুনা ইন্টারনেট জগতে ‘মুনাটিক’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সমাজে জীবনযাপন এবং সংস্কৃতিকে নিয়ে রসাত্মক এবং বুদ্ধিমান ব্যঙ্গকৌতুক নিয়ে মাতিয়ে রেখেছেন তার বৃহৎ ফ্যানবেস-কে।

মুনার কৌতুক ছুঁয়ে যায় নানা বিষয়কে। যেখানে বাঙালি মেয়েদের ওজন হ্রাস নিয়ে নানারকম হাস্যকর প্রতিক্রিয়াকে মুনা দিয়েছেন এক ক্যামেরাবন্দি রূপ, কিংবা ব্যঙ্গকৌতুকের সঙ্গে অভিনয় করে দেখিয়েছেন দাওয়াতে আসা নানারকম মেহমানের আচরণ।

“যদি আমাকে বলতে হয় কীভাবে আমি ‘মুনাটিক’ হয়ে গেলাম, আমি সেটাকে বলবো একটি আনন্দময় দুর্ঘটনা। ২০১৪ সালে আমি জানতে পারি, আমি তীব্র বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগের ব্যাধিতে ভুগছি। আমার সকল বিশ্বাস এবং আমার সমস্ত পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেল চোখের সামনে। আমার কর্মজীবন এবং আপন জগতে, আমি একদম দিশেহারা হয়ে গেলাম”, মুনা জানান আমাকে।

মুনা বলেন, প্রায় মাসখানেক এই মানসিক ব্যাধির সঙ্গে থাকার পর তিনি চিকিৎসা নেন। সেই চিকিৎসা বেছে নেওয়াকে মুনা বলেন তার জীবনের “অন্যতম বুদ্ধিমান এবং সবচাইতে কার্যকারী সিদ্ধান্ত।”

মুনার মতে, ‘মুনাটিক’ এক বছরের সঙ্গত থেরাপি, নিজের প্রতি খেয়াল এবং ভালো মানুষের মাঝে নিজেকে রাখার ফল, এবং আজ মুনা অবশেষে নিজেকে নিয়ে সুখী।

তবে ইন্টারনেটে একজন নারী তারকাকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় এবং মুনার মাঝে-মধ্যে মনে হয় সেসব প্রতিকূলতা তাকে হার মানিয়ে দেবে।

“কিছু সময়, আমার মনে হয় আমাকে বুলডোজার মাটিতে মিশিয়ে ফেলছে, যখন দেখি অনেক মানুষ মন্তব্য করে নারীর জন্য কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক। এটা কঠিন। আমাকে অনেক সতর্ক থাকতে হয়, আমি কী কাপড় পরছি, বা কি ভাষা ব্যবহার করছি, সামাজিক এবং ধার্মিক অনুভূতি রক্ষার জন্য। আমি আমার হাস্যরস দিয়ে যেসব বিষয়কে ফুটিয়ে তুলতে চাই, তা অনেকগুলিই নারীর জন্য নিষিদ্ধ বা ট্যাবু। পুরুষ কৌতুকাভিনেতারা যৌনতা কিংবা অভক্তির মতো টপিক নিয়েও কৌতুক করতে পারে। একজন উদীয়মান নারী কৌতুকাভিনেতা হিসেবে, আমি হয়তো সেই প্রশ্রয় পাব না, ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছাড়া। সাহসী এবং বিশ্বাসী নারীকে অনেকেই এখনো ভুল বোঝে”, মুনা বলেন।

একজন মুসলিম হওয়ার ফলে মুনাকে আরও নানাধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তবে মুনা বলেন, সেগুলোও কাঁধে নেবেন তিনি। কেননা তিনি অন্য নারীদেরকে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করতে চান।

“আমাকে আরও অনেক নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয় পশ্চিমা পোশাকআশাক পরে কিংবা হিজাব ছাড়া ছবি কিংবা ভিডিও আপলোড করলে। অনেক নেতিবাচকতার মধ্যেও, আমি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাই। কেননা তা থেকেও আমি আরও অনেক বেশি ইতিবাচক সমর্থন, সহায়তা এবং অনুপ্রেরণা পাই নানা মানুষ থেকে। বিশেষ করে মেয়েদেও কাছ থেকে! আমি এমন নারীদের সঙ্গে চলছি, যারা দৃঢ়, বুদ্ধিমান, স্নেহশীল, এবং আমি তাদের কাছে সম্মানিত বোধ করি তাদের অনুপ্রেরণার জন্য”, মুনা বলে।

ফারহানা মুনা নিজেই অনেক নারীর অনুপ্রেরণার উৎস, তবে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তার নিজের অনুপ্রেরণা কে, নির্দ্বিধায় মুনার উত্তর হচ্ছে আমেরিকান টিভি জগতের অন্যতম নারী ব্যক্তিত্ব ওপরা উইনফ্রে এবং তার আপন শাশুড়ি।

“আমি বড় হয়েছি ওপরা উইনফ্রের অনুষ্ঠান দেখে। তিনি সবসময় নারীর ক্ষমতায়ন, শক্তি, সহমর্মিতা এবং নিজের আপন অধিকার আদায়ের পথিকৃৎ হয়ে থাকবেন। আর আমার বাসায় আমার অনুপ্রেরণা আমার শাশুড়ি। তিনি ভারতের পাঞ্জাব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান এবং একজন পিএইচডি প্রফেসর। যেখানেই কাজ করি না কেন, সেখানেই ভালো করার জন্য তিনি আমাকে সবসময় সমর্থন করেন এবং অনুপ্রেরণা জোগান।”

- কাজী মাহদী আমিন