রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন ও এক টুকরো বাংলাদেশ
০৮/০৫/২০১৭

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন ও এক টুকরো বাংলাদেশ

-

যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের উনিশ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর ডর্মরুমের দেয়ালে বিশাল আকৃতির বাংলাদেশের পতাকা ছিল। ভার্সিটির এসাইনমেন্ট এবং রিফ্লেকশন পেপারগুলোতে মেয়েটি বারবার লিখেছিল তার দেশের কথা। বলছিলাম জুলাই ১, ২০১৬ গুলশানের হলি আর্টিজানে ধর্মান্ধ পশুদের হামলায় চিরবিদায় নেয়া অবিন্তা কবিরের কথা। জুলাই-এর বৃষ্টিস্নাত এক বিকেলে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় অবিন্তা গ্যালারি অফ ফাইন আর্টস থেকে ঘুরে এলাম। বাংলাদেশ নামটা বুকে ধারণ করা এক কিশোরীর গল্প জানা গেল, শোনা হলো তাঁর স্বপ্নের অবিন্তা ফাউন্ডেশনের কথা।

অবিন্তা ‘বাংলাদেশি’ ছিলেন
অবিন্তা ফাউন্ডেশন সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় অবিন্তার কথা। গত বছরের জুলাই মাসের প্রথম দিনটিতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দেশের অনেক নামকরা পত্রিকাই তাকে আমেরিকান অথবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান বলে সম্বোধন করেছে। তবে গ্যালারির কিউরেটর সুলতান মাইনুদ্দিনের কাছে অবিন্তা সম্পর্কে জানলাম আরো গভীরভাবে। অবিন্তার পোট্রেট থেকে শুরু করে এমোরির ডর্মের দেয়ালে দেশের পতাকা, দেশকে ঘিরে পরিকল্পনা, কিংবা মা’কে লেখা চিঠিতে বারবার ফিরে আসার আকুতি নিজ চোখে দেখে সহস্রবার মনে প্রশ্ন জেগেছে অবিন্তার প্রথম পরিচয় যদি বাংলাদেশি নাহয় তবে সত্যিকারের বাংলাদেশি কে?

এটা সত্য যে অবিন্তার আমেরিকান পাসপোর্ট ছিল, তবে তা তো আরো অনেকেরই থাকে। বাংলাদেশে জন্ম নেয়া অবিন্তা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছেন ফোর্থ গ্রেড পর্যন্ত। তারপর ঢাকায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ালেখা শেষ করে আটলান্টার এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। এটুকু তথ্য হয়তো অনেকেরই জানা। তবে যা অজানা তা হলো বিদেশ বিঁভূইয়ে ডাক্তারি পড়ার সুযোগের মতো সোনার হরিণের নাগাল পেলেও মনেপ্রাণে নিজেকে বাংলাদেশি ভাবা অবিন্তা সাবজেক্ট হিসেবে বিজনেস স্টাডিস বেছে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র তাড়াতাড়ি পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন বলে। বাস্কেটবল কোর্টে দুরন্ত কিশোরী অবিন্তা রং-তুলির আঁচড়ে ক্যানভাস রাঙাতেন মনের মতো করে। মানুষকে ভালোবাসার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন অবিন্তা। আর সেই ভালোবাসা শুধুমাত্র মা-বাবা, পরিবারের মধ্যেই সীমিত থাকেনি। মানুষের প্রতি অবিন্তার ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়েছিল শহরের জ্যামে গাড়ির জানালায় আলতো টোকা মারা মেয়েটি পর্যন্ত। মানসিক-শারীরিক নির্যাতনের ফলাফলস্বরূপ জীবনযুদ্ধে অসার হয়ে পড়া নারীটি কিংবা এসিডদগ্ধ আট বছরের শিশু দুর্জয় পর্যন্ত, যাদের কথা অবিন্তা ভাবতেন-লিখতেন এবং যাদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করতেন। আর তাইতো ২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর ফ্রেশম্যান সেমিনারে অবিন্তা লিখেছিলেন, ‘আমি আমার দেশের মানুষদের নিয়ে ভাবি। তাই দেশে ফিরে দুস্থ মানুষদের সাহায্যে একটি এনজিও করতে চাই। আমি সব সময় অনুভব করি ছোটোখাটোভাবে হলেও দেশের জন্য কাজ করাটা আমার দায়িত্ব।’ ভার্সিটির পেপারগুলোয় লাইনের পর লাইন অবিন্তার দেশপ্রেমের স্বাক্ষর বহন করে যায়। এমোরির ডর্মে সেই লাল-সবুজের পতাকা, সহপাঠীদের বক্তব্য এবং নিজের ফাউন্ডেশনকে ঘিরে নীতি নির্ধারণী ও গঠনতান্ত্রিক পরিকল্পনা দেখে বলতেই হয় অবিন্তার প্রথম পরিচয় তিনি একজন বাংলাদেশি। স্রোতের টানে গা ভাসিয়ে না দেয়া এক নারী যার চোখে বাংলাদেশ দেখা যায়।

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন
অবিন্তার অসমাপ্ত কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে চলতি বছরের ৪ঠা মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন। রাজধানীর শাহজাদপুরে নবসজ্জিত অফিস থেকে কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি এই অল্প সময়ের মধ্যেই নাটোরে পাঁচটি, ঢাকার ভাটারা এবং বাসাবোতে দুটি স্কুল স্থাপন করেছে। এই সাতটি স্কুলে দুই শতাধিক বাচ্চাদের প্রাথমিক অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা প্রদানের কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক সৈয়দা শওকত। এর মধ্যে বাসাবোতে স্থাপিত স্কুলটিতে রয়েছে ৩৬জন মেয়ে যাদের ১২জনের তিনটি গ্রুপ ভাগ করে আলাদা শিক্ষক রেখে পড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে মনোবিদ নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফাউন্ডেশনে নিযুক্ত কমিনিউটি অফিসারের মাধ্যমে বস্তি এলাকার নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো থেকে সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়ে বাছাই করে স্কুলে ভর্তির কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এছাড়া কড়াইল বস্তির আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য, শীতার্তদের বস্ত্রদান, বৃক্ষরোপণ অভিযান, শিশু হাসপাতালে ইনকিউবেটর স্থাপনসহ নিয়মিতই একের পর এক জনসেবামূলক কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একই কমপাউন্ডে বৃদ্ধাশ্রম (ওল্ড হোম) এবং গার্লস ডর্ম করার পরিকল্পনা করছে এই ফাউন্ডেশন। মূলত সমাজ থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধ এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একসঙ্গে রেখে একে অপরকে সাহায্য করার পরিবেশ তৈরি করার উদ্দেশ্যেই এ-ধরণের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানান ফাউন্ডেশনটির অ্যানালিস্ট আহমেদ জাওয়াদ। বলার অপেক্ষা রাখে না এর সবকিছই এগোচ্ছে অবিন্তার পরিকল্পনা মতো, তার রেখে যাওয়া ব্লু-প্রিন্ট এবং সুস্পষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতে।

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম শুধুমাত্র দেশের গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই। ফাউন্ডেশনটির উদ্যোগে এমোরি ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া হ্যাবিট্যাট ফর হিউম্যানিটির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নারীদের জন্য দুবছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রাম এবং ১২টি ঘর নির্মার্ণের কাজ শুরু হবে। ঢাকার স্কুলগুলোতে লাইব্রেরি স্থাপনের পাশাপাশি অভিভাবকদের নিয়েও কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার মাত্র মাস কয়েকের মধ্যে বেশ সক্রিয় এই ফাউন্ডেশনটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং খেলাধূলার মতো ক্ষেত্রগুলোতে সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে এসে দাঁড়াতে চায়। একই সঙ্গে পশ্চাৎপদ নারীসমাজের কল্যাণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিপদে সমাজের সাহায্যে এগিয়ে আসবে প্রতিষ্ঠানটি। অবিন্তার স্বপ্ন, সংকল্প, সততা এবং দেশপ্রেমকে পুঁজি করে এগিয়ে চলছেন প্রতিষ্ঠানটির একেক জন মানুষ। আর এই মহাযজ্ঞে আর্থিক, মানসিক কিংবা সময় দিয়ে হলেও যে কেউ যোগ দিতে পারেন। আর্থিক সহায়তার জন্য ফাউন্ডেশনটির ওয়েবসাইটে (www.abintafoundation.org) ডোনেট অপশন চালু করার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া ফাউন্ডেশনটির ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও (www.facebook.com/AbintaKabirFoundation) এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানা যাবে, চাইলে যুক্ত হওয়া যাবে। স্বল্পপরিমাণে ব্যক্তিগত সাহায্য থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অনুদানের জন্যও উন্মুক্ত আছে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন। অবিন্তার মা এবং ফাউন্ডেশনের কো-ফাউন্ডার রুবা আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে অবিন্তার রেখে যাওয়া দিকনির্দেশনা সামনে রেখে কাজ করবো আমরা। অবিন্তা আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু এই ফাউন্ডেশনের কাজের মধ্য দিয়ে সে বেঁচে থাকবে বহুদিন।”

ওপারে বসে অবিন্তা হয়তো সবই দেখছেন। হয়তোবা ক্যানভাসে দেশের পতাকা আঁকছেন কিংবা বহুদূরের পৃথিবীকে নিয়ে ভাবছেন নিজের মতো করে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা যার এত প্রবল মৃত্যুর সাধ্য কী তাকে চিরতরে মুছে ফেলার? ইতিহাসের পাতায় একজন প্রকৃত বাংলাদেশি হিসেবে বেঁচে থাকুক অবিন্তা, বেঁচে থাকুক তার স্বপ্নের ফাউন্ডেশন।

- নাইব রিদোয়ান