রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / মনুষ্যত্ব বোধ জাগ্রত হোক
০৮/০১/২০১৭

মনুষ্যত্ব বোধ জাগ্রত হোক

-

গৃহকর্মী নির্যাতন ও নিপীড়নজনিত মৃত্যুর হার সংক্রান্ত যে চিত্র, সেটা রীতিমত ভয়াবহ। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিলস (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ) নামের একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে, সারা দেশে গত পাঁচ বছরে নির্যাতিত ১৮২ জন গৃহকর্মীর মৃত্যু ঘটেছে। আহতের সংখ্যা ১৪৩। গত ২০১৫ সালে মোট ৭৮ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হন। তাদের মধ্যে প্রাণ গেছে ৩৯ জনের। কী কী কারণ এসব মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্যে? বিজ্ঞজনদের অভিমতঃ আইনের সঠিক প্রয়োগ হয় না। পারিবারিক শিক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিহীনতা, নৈতিকতার অভাব, অতিমাত্রায় স্বার্থপরতা ইত্যবিধ কারণে সমাজে অবক্ষয় ঘটে চলেছে। বেড়েছে এমন ধরনের হৃদয়হীন আচরণ ও তজ্জনিত ন্যক্কারজনক ঘটনাপুঞ্জ।

সমাজের বিত্তবান ও প্রভাবশালীরাই মূলত এমন নিষ্ঠুর জঘন্য কাজ করে চলেছে। গৃহকর্মী ও তাদের অভিভাবকদের অসহায়তা ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে। এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যে একেবারেই হয় না, তা নয়। কিন্তু সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। হয়তো সে কারণেই এই বিষবৃক্ষ উৎপাটন করা সম্ভবপর হচ্ছে না। দৃষ্টান্তমূলক প্রতিকারের উদাহরণ এবং শাস্তিবিধানের নজির কোথায়? অনাকাক্সিক্ষত এসব কর্মকাণ্ডের নিরোধে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫’ অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু বিধিমালা এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এই নীতিমালাকে অবিলম্বে আইনে পরিণত করে তার সুষ্ঠু ও সঠিক প্রয়োগের ওপর সংশ্লিষ্ট মহল গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ ২০০৩ সালের তথ্য অনুযায়ী গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের সংখ্যাই হচ্ছে এক লাখ ২৫ হাজার। এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই মেয়ে শিশু। বিলস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহকর্মীদের গড় মজুরি ৫০৯ দশমিক ৬ টাকা। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ শ্রমিক নিয়মিত মজুরি পায় না। বকাঝকা হজম করে ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ যৌন নিপীড়ন সহ্য করে।

পরিসংখ্যান-তালিকা আর দীর্ঘ করতে চাই না। মূল কথা হলো, আমাদের মধ্যে মানবিকতা নামের গুণটি কমে যাচ্ছে। হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধপরায়ণতা আমাদের মনকে কলুষিত, অন্ধকার করে রাখছে। মানুষ মানুষের জন্য- এই মর্মবাণী আমরা বিস্মৃত হয়ে থাকছি। আমাদের কুপ্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছি। এই অবস্থা কোনোমতেই সম্মানজনক নয়। হতদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি আমরা যেন আরো সহানুভূতিশীল হতে পারি, বিপদে বিপর্যয়ে সহমর্মী মন নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি- সেটাই হোক সবার কাম্য। মনুষ্যত্বের জয় হোক।

- তাসমিমা হোসেন