সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / কেন চিকিৎসা অভাবে ‘একাত্তরের জননী’?
০৭/৩০/২০১৭

কেন চিকিৎসা অভাবে ‘একাত্তরের জননী’?

-

চট্টগ্রামের রমা চৌধুরীকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী-মাতা হিসেবে জানি। তিনি আলোচনায় আসেন কয়েকবছর আগে। ২৭ জুলাই ২০১৩ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান গণভবনে। ৪০ মিনিটের সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে শহিদমাতা হিসেবে অনন্য অবদান রাখায় আর্থিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিলে তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। একই বছর অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা অর্জন করেন এই বীরমাতা। বর্তমানে তিনি ভীষণভাবে অসুস্থ। অর্থকষ্টে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। গত ২০ জুন ২০১৭ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে এসেছে ‘অর্থের অভাবে লেখিকা রমা চৌধুরী হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।’

রমা চৌধুরীর বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন জানালেন, রমা চৌধুরী নিজে কারো কাছ থেকে অর্থ-সহযোগিতা নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে চান না। নিজের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চান। এক্ষেত্রে সহযোগিতা করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাঁর লেখা বই কেনা। ঢাকার প্রকাশকরা চাইলে উপযুক্ত সম্মানী দিয়ে তাঁর কোনো কোনো বই পুনর্মুদ্রণের ব্যবস্থা নিয়েও সহযোগিতা করতে পারেন।

মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরীর সংগ্রামী জীবনের কিছু-কথা
রমা চৌধুরী একাত্তরের বীরমাতা। মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে ঘরবাড়ি, তিন শিশুসন্তান, স্বামী সবকিছু হারিয়ে পথে বসেন ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করা এই নারী। পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষিক। ১৯৭১ সালের ১৩ মে তিন শিশুসন্তান নিয়ে চট্টগ্রামের পোপাদিয়ায় গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তিনি। পাকিস্তানি দালালদের সহযোগিতায় পাকসেনারা রমা চৌধুরীদের বাড়িতে হানা দেয়। নিজের মা এবং দুই শিশুসন্তানের সামনে তাঁকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। বাড়িও পুড়িয়ে দেয়। অনাহারে, অর্ধাহারে শীতে দু’সন্তান সাগর আর টগরের অসুখ বেঁধে যায়। ২০ ডিসেম্বর রাতে মৃত্যুবরণ করে সাগর। একই অসুখে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায় টগর।

দেশ স্বাধীন হলে শুরু হয় আরেক লাঞ্ছনা। সমাজের চোখে তিনি তখন এক ‘ধর্ষিতা নারী’। তৃতীয় ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগো পাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শবদেহ পোড়ানোতে বিশ্বাস করেন না রমা চৌধুরী। তাই মৃত্যুর পর তাঁর তিন সন্তান ও মাকে দেওয়া হয়েছে মাটিচাপা। এরপর আর জুতো পায়ে দেননি। এ-প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমার তিন ছেলে মাটির নিচে। তাদের শরীরের উপর দিয়ে জুতা পায়ে আমি হাঁটি কী করে? আমার সন্তানদের কষ্ট হবে না?’

লেখক রমা চৌধুরী সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এ পর্যন্ত রমা চৌধুরীর ২০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন সাহিত্যের প্রায় সব ধরনের শাখায়। সমালোচনা সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মৃতিকথা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাস গ্রন্থ, গল্প, উপন্যাস, লোক-সংস্কৃতিবিষয়ক গ্রন্থ, প্রবন্ধ এবং ছড়া। তাঁর অধিকাংশ বই আমার সংগ্রহে আছে।

রমা চৌধুরীর ছোটগল্প সংকলন ‘আগুনরাঙা আগুনঝরা অশ্রুভেজা একটি দিন’; প্রকাশকাল ২০১১। রমা গল্পের আখ্যানভাবে চিরায়ত গল্পবলার কৌশল অবলম্বন করেছেন। শুরুটা করছেন এভাবে-‘সেই কিশোরীটি যে বধূ হতে চেয়েছিল অথচ পারলো না, তারই জীবনের করুণ-মধুর কাহিনী আজ বলে যাবো।’ এরপর তিনি গল্পবলার কথ্যরীতি অবলম্বন করে গল্পটি লিখে চলেছেন। রমা চৌধুরীর গল্পে ছোট ছোট কোলাজের মতো করে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির চিত্র পাওয়া যায়।

সমালোচনা সাহিত্যে আমরা মোটামুটিভাবে সাহিত্যবোদ্ধা রমা চৌধুরীকে পাই। তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেশাজীবনে ছাত্র-ছাত্রীদের সাহিত্য পড়িয়েছেন। কাজেই তাঁর এই দৃষ্টিটা কিছুটা হলেও একাডেমিকভাবে তৈরি।
স্মৃতিকথামূলক ২টি বই লিখেছেন রমা চৌধুরী। একটি ‘সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। অন্যটি ‘স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়’। এছাড়াও ‘একাত্তরের জননী’ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথামূলক উপন্যাস। ১৯৬১ সালে রমা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উত্তালক্ষণে তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন। এমনও বলা হয়ে থাকে, তিনিই চট্টগ্রামের প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর নারী। কাজেই তাঁর এই স্মৃতিকথার একটা ঐতিহাসিক-সামাজিক মূল্য আছে। তাঁর অপর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থটি সরাসরি ইতিহাস-সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধচলাকালে চট্টগ্রামে শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত ছিলেন রমা চৌধুরী। একে তো শিক্ষিত, সচেতন মানুষ, তার ওপর নারী, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর হিন্দু-পরিচয়। সবমিলিয়ে পাকিস্তানি বর্বর আর্মিদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হন তিনি। মুক্তিযুদ্ধচলাকালে তিনি নিজে যেমন নির্যাতিত হলেন, তেমনি নিজের দুই সন্তানকে হারালেন। তাঁর জীবনের সেই ক্রান্তিকাল নিয়ে তিনি লিখেছেন এখানে। এছাড়াও তাঁর স্মৃতিতে একাত্তর নিয়ে অগ্রন্থিত কিছু গদ্য আছে। স্মৃতিকথা নামে কয়েকপর্বে ছাপা হয়েছে পাক্ষিক অনন্যা পত্রিকায়। ২০১৫ সালের অনন্যা ঈদসংখ্যায় নিজের জীবনে বেড়ালের ভূমিকা নিয়ে অসাধারণ এক গদ্য লেখেন। যতদূর মনে পড়ে, রমা চৌধুরী তাঁর ৮টি বই উৎসর্গ করেছেন তাঁর ৮ বেড়ালকে। সাহিত্যবিশ্বে এ এক অনন্যনজির বটে।

রমা চৌধুরীর কবিতার বই দুটো-‘স্বর্গে আমি যাব না’ ও ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’। সামগ্রিক কবিতায় আমরা প্রতিবাদী এবং মানবিক ও প্রেমময়ী নারী রমা চৌধুরীকে পাই। তিনি তাঁর কবিকণ্ঠে দ্রোহ এঁটে স্পষ্টভাষায় নারীর অধিকার অর্জনের কথা বলেছেন। ‘মেয়েদের মা হওয়ার সুযোগ দাও’ শীর্ষক গদ্যে তিনি বলেছেন, বন্ধ্যা নারী যেমন আছে, বন্ধ্যা পুরুষও তেমন আছে। বন্ধ্যা নারীর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে সন্তানের বাবা হতে পারছে। কিন্তু বন্ধ্যা স্বামীর স্ত্রীর জন্য সেই স্বাধীনতা কেন থাকবে না? ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে বর্ত্তা’-এ নীতির প্রচলন কবে হবে? ‘আমি পাশ-বালিশ হতে আসিনি’ কবিতায় রমা লিখেছেন, ‘হে পুরুষ!/ আমি তোমার পাশ-বালিশ/ হতে দুনিয়ায় আসি নি,/ মাথার বালিশ হ’তেও না।...’ আবার তিনি পৃথিবীর প্রতি তার রোমান্টিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন ‘স্বর্গে আমি যাব না’ কবিতায়Ñ ‘যাব না, ভাই, যাব না/ স্বর্গে আমি যাব না/ দুধের নদী, ক্ষীরের সাগর/ যতই সেথা থাকুক না।/ চাই না যেতে স্বর্গে আমি/ যদি বকুল সেথা নাহি ফোটে।...’

রমা চৌধুরীর ছড়াকারও। ‘১০০১ দিন যাপনের পদ্য’ শিরোনামে তাঁর একটি ছড়াও বইও আছে। অধিকাংশ ছড়া নীতিকথামূলক, সরল ছন্দে আঁটা। শিশু-কিশোরদের জন্য ভীষণ উপযোগী এবং উপকারী পাঠ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রমা চৌধুরী সাহিত্যিক হিসেবে যতটুকু পরিচিতি পেয়েছেন, তার সিংহভাগজুড়ে আছে তাঁর প্রাবন্ধিক পরিচিতি। বৈচিত্র্যময় বিষয় নিয়ে তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর একটি বইয়ের নাম ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবন-দর্শন’। এই বইয়ে তিনি চট্টগ্রামের চাটগাঁর জনমানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছড়া ও প্রবাদ সংগ্রহ করেছেন, এবং তার অর্থসহ বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশ্লেষণে তিনি ছড়া ও প্রবাদের তাত্ত্বিক মূল্য, নীতিকথা, কৃষিকথা, ব্যঙ্গ ও রঙ্গ, ধাঁধা প্রভৃতি অনুষঙ্গ ধরে ধরে আলোচনা করেছেন। নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলাদা করে গ্রন্থ লেখার পাশাপাশি পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে লিখেছেন ‘যে ছিল মাটির কাছাকাছি’ বইটি। জসীমউদ্দীনের ‘কবর’, ‘রাখালী’, ‘বালুচর’ ও ‘বেদের মেয়ে’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর মৌলিক চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। বইয়ের ‘বেদনার কবি’ প্রবন্ধটি তিনি শুরু করছেন এভাবে-
ÒOur Sweetest Songs are those
That Tell of Saddest Thoughts -P.B. Shelley

অর্থাৎ বিষণ্ণতা চিন্তার প্রতিফলন ঘটে আমাদের মধুরতম সংগীতেই। অন্যভাবে বলতে গেলে আমাদের মধুরতম গান সেগুলিই যেগুলিতে বিষণ্ণতম চিন্তার প্রতিফলন। ইংরেজি কবি শেলীর বিখ্যাত কবিতা ‘টু অ্যা শাইলার্ক’-এর উপরের চরণদুটি বেদনার কবি জসীমউদদীনের ‘কবর’-এর ক্ষেত্রে এত বেশি খাটে যে, মনে হয় উক্ত কবিতাটিই বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম গীতিকবিতা।” [‘যে ছিল মাটির কাছাকাছি’]

‘নীল বেদনার খাম’ বইটি মা ও ছেলের বিভিন্ন সময় বিভিন্নজনকে লেখা পত্রাবলী দিয়ে সাজানো। রমা চৌধুরীর ছেলে দীপংকর টুনু কবি ছিল। একমাত্র প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘হৃদয়ের ভাষা’। কিশোরকালে তাঁর লেখার হাত দেখে অনেকে তাঁর সঙ্গে কিশোরকবি সুকান্তের তুলনা করত। নিয়তির কি পরিহাস-দীপংকরও সুকান্তের মতো অকালেই, মাত্র একুশ বছর বয়সে মারা যায়। মা রমা চৌধুরী ছেলে দীপংকরের চিঠিগুলো নানাভাবে সংগ্রহ করে এই বইতে সংকলন করেছেন। সেই অর্থে বইটি একটি সম্পাদিত গ্রন্থ।

রমা চৌধুরী চট্টগ্রাম থেকে লেখেন, রাজধানীতে বা জাতীয়-পর্যায়ে লেখক হিসেবে তিনি ততটা পরিচিত নন। কারণ তাঁর লেখা দেশের প্রথমসারির কাগজগুলোতে প্রিন্ট হতে দেখা যায় নি। রাজধানী থেকে কোনো সম্পাদক-প্রকাশক তাঁকে স্মরণ করেননি। শিক্ষকতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি নিজের বই চট্টগ্রামের পথে পথে খালি পায়ে ফেরি করে বেড়িয়েছেন কয়েক-দশক। এ থেকে যে অর্থ এসেছে তা দিয়ে নিজে জীবনধারণের পাশাপাশি তিনি তাঁর অকাল-প্রয়াত ছেলের নামে ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথ আলয়’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। নিজের বই ফেরি করা নিয়ে বলেছেন, ‘কারো কাছে জীবনে হাত পাতিনি। আমি নিজের লেখা বই বিক্রি করি। যেদিন বিক্রি করতে পারি সেদিন খাই, যেদিন পারি না সেদিন উপোষ থাকি।’

- মোজাফফর হোসেন