সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / শ্রীমঙ্গলের চায়ের রাজ্যে
০৭/২২/২০১৭

শ্রীমঙ্গলের চায়ের রাজ্যে

-

বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল ‘চায়ের রাজধানী’ বলেই পরিচিত। বিশ্বের অন্যতম উঁচুমানের চা উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়ে থাকে শ্রীমঙ্গলে। তবে সিলেটের শ্রীমঙ্গল উপজেলা শুধুমাত্র চায়ের জন্যই পরিচিত নয়। সুন্দর সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে আবদ্ধ শ্রীমঙ্গলে আছে ঘুরে দেখার মতো অনেক গন্তব্য। বনজঙ্গল এবং পশুপাখির কিচিরমিচিরে ভরা শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের একটি অনন্য ইকো-টুরিজম স্পট। শ্রীমঙ্গলে আপনি সবচেয়ে বেশি দেখতে পাবেন সবুজে মোড়ানো চোখজুড়ানো চা বাগানগুলোকে। আর পাহাড়গুলোতে অনুভব করবেন একধরনের জনমানবহীন নিস্তব্ধতা, যা শহুরে ছাড়িয়ে মনে এনে দেবে প্রশান্তি। চা-বাগান ছাড়াও আর কি কি দেখবার আছে শ্রীমঙ্গলে চলুন জেনে নেয়া যাক।

লাউয়াছড়া
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান শ্রীমঙ্গল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অসাধারণ সুন্দর এই উদ্যানের মাঝে দীর্ঘ সময় ধরে পায়ে হেঁটে দেখা যায় নানা জীবজন্তু ও গাছপালা। প্রায় ৪৬০ প্রজাতির পাখি, স্তন্যপায়ী এবং সরীসৃপের দেখা পাওয়া যায় লাউয়াছড়াতে। যার মধ্যে রয়েছে হরিণ, বন্যমুরগি, অজগর, বানর, মাকড়সা, উল্লুক, গিবন এবং অনেক প্রজাতির পাখি। কিছু জায়গায় বন বেশ ঘন, সেই সব অঞ্চলে ডোরাকাটা চিতা বাঘ দেখা যায় মাঝেমধ্যে।

মাধবকুন্ড
বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু ঝরনা হচ্ছে মাধবকুন্ড। এটি প্রায় ২০০ ফিট (৬১ মিটার) উঁচু, এবং শ্রীমঙ্গল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই ঝরনায় যাওয়ার জন্য লম্বা পথ পাড়ি দিতেও খারাপ লাগে না, কেননা পুরো পথে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত চা বাগান দেখা যায়, যা এক মনজুড়ানো দৃশ্য।

হাকালুকি হাওর
হাকালুকি হাওর দেশের অন্যতম বৃহৎ এক জলাভূমি, যা শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৯২ বর্গকিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত। এই জলাভূমির বিস্তীর্ণ মৎস্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে প্রায় ২ লক্ষ মানুষের বসবাস। শীতকালে হাওরে অতিথি পাখিরা ভিড় করে, যা দেখার জন্য বহু পাখিপ্রেমী মানুষ এখানে আসে। হাওরে নৌকায় চড়েও ঘুরে বেড়ানো যায়।

রেমা-কেলাঙ্গা বনাঞ্চল
শ্রীমঙ্গলের পার্শ্ববর্তী উপজেলা হবিগঞ্জে অবস্থিত রেমা-কেলাঙ্গা বনাঞ্চল তারাপ পাহাড় সংরক্ষিত বনের একাংশ। রেমা-কেলাঙ্গা অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে বহু পাহাড়ের তলদেশে, যার ফলে এই অঞ্চলে অনেক জলাশয় এবং জলপ্রপাত তৈরি হয়েছে। এসবের মাঝেই নানাধরনের পশুপাখি দেখা যায় এই অভয়ারণ্যে। প্রায় ৩৭ জাতের স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ উভচর প্রাণী, এবং ৬৩৮ প্রকার উদ্ভিদ আছে রেমা-কেলাঙ্গাতে। ত্রিপুরা, সাঁওতাল, তেলুগু এবং উরাং ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাস এই বনের মধ্যেই।

সাতছড়ি বন
সাতছড়ি বন শ্রীমঙ্গলের ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত। এই বনাঞ্চলটি লাউয়াছড়া থেকেও বৃহৎ একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, তবে এখানে মানুষের আনাগোনা তুলনামূলকভাবে কম। এই সংরক্ষিত অঞ্চলে মূলত গ্রীষ্মকালীন গাছের সমাহার বেশি। বেশ কিছু হাঁটার পথ চিহ্নিত করা আছে এই বনে। উল্লুক, গিবন বানর, লেঙ্গুর, জংলি হাঁস, কাঠঠোকরা, হর্নবিল ইত্যাদি জীবজন্তু দেখা যায় বহু জলপ্রপাতের আশপাশে।

টি এস্টেট
শ্রীমঙ্গলের সব চা বাগান ট্যুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত নয়, যদি না আগে থেকে বলে রাখা হয়। তবে চায়ের প্রক্রিয়াজাতকরণ দেখতে হলে ‘শ্রীমঙ্গল টি ফ্যাক্টরি’ কিংবা ‘টি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ ঘুরে দেখতে পারবেন। তাছাড়া, সব চা বাগানেই কর্মীদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে অনেক বাস ছেড়ে যায় শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে। টিকেট খরচ ৫শ টাকা থেকে ৯শ টাকার মধ্যে। তাছাড়া, কমলাপুর থেকে শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার সরাসরি ট্রেন ছেড়ে যায় সপ্তাহের প্রতিদিন।

ইকো ট্যুরিজমের প্রসারের ফলে শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে তৈরি হয়েছে বহু রিসোর্ট, হোটেল এবং রেস্তোরাঁ। বেড়াতে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা আছে এই জেলায়। শ্রীমঙ্গলে থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে কিছু তথ্য জেনে নিন।

হোটেল ও রিসোর্ট:

গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট
শ্রীমঙ্গল থেকে বের হওয়ার রাস্তায় চোখে পড়বে শ্রীমঙ্গলের অন্যতম বৃহৎ টি রিসোর্ট 'গ্র্যান্ড সুলতান'। চা বাগানের মাঝে, আঁকাবাঁকা পাহাড়ের মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল পাঁচ তারকা ক্যাটাগরির এই রিসোর্ট। সবুজ শ্যামল নীরবতার মাঝে গ্র্যান্ড সুলতান আপনাকে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেবে। তার মধ্যে সুইমিং পুল, বাচ্চাদের জন্য আলাদা খেলার জায়গা, রেস্তোরাঁ, গলফ কোর্ট এমনকি নৌকাও পাবেন লেকে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। বিলাসবহুল অবকাশের জন্য গ্র্যান্ড সুলতান শ্রীমঙ্গলে একটি অন্যতম রিসোর্ট। যোগাযোগ - +৮৮ ০২ ৯৮৫৮৮২৭

দুসাই রিসোর্ট
অবকাশ যাপনের জন্য আরেকটি বিলাসবহুল রিসোর্ট হচ্ছে শ্রীমঙ্গল থেকে কিছু দূরে অবস্থিত 'দুসাই রিসোর্ট'। এখানে স্পা থেকে শুরু করে হানিমুনের জন্য আছে বিশেষ স্যুইটের ব্যবস্থা। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত এই রিসোর্ট। চা বাগানের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এই রিসোর্টের। দুসাই থেকে মৌলভীবাজার শহর বেশ কাছে। যোগাযোগ - +৮৮০ ১৬১৭০০৫৫১১

রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট
রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট শ্রীমঙ্গল শহরেই অবস্থিত। বিভিন্ন পর্যটন স্পট এখান থেকে বেশ কাছে। আশপাশে রেন্ট-এ-কার এবং রেস্তোরাঁর সুবিধা আছে ভালো। মাঝারি বাজেটের জন্য রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট বেছে নিতে পারেন। যোগাযোগ - +৮৮০১৯৩৮৩০৫৭০৬

শ্রীমঙ্গল রিসোর্ট
শহরের প্রাণকেন্দ্রে আরেকটি রিসোর্ট হচ্ছে শ্রীমঙ্গল রিসোর্ট। মাঝারি বাজেটের জন্য এই রিসোর্ট পছন্দের তালিকায় থাকে পর্যটকদের। শহরের মাঝে হওয়ায় যাতায়াতের কোনো সমস্যা হয় না।

খাওয়ার ব্যবস্থা:

পানসী
সিলেটের জনপ্রিয় পানসী রেস্তোরাঁর একটি শাখা রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। পানসীতে আপনি সাধারণ ভাতের পাশাপাশি, বিরানি, কাবাব, পরোটা ইত্যাদি পাবেন। খাওয়ার মান অনেক ভালো এবং সার্ভিস অসাধারণ। শ্রীমঙ্গলে শহরে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই চিনিয়ে দেবেন পানসীর রাস্তা।

কুটুমবাড়ি
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার পাশেই আছে কুটুমবাড়ি রেস্তোরাঁ। এই রেস্তোরাঁ খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ এবং খাওয়ার মান বেশ ভালো।

নীলকণ্ঠ টি ক্যাবিন
শ্রীমঙ্গলের অন্যতম জনপ্রিয় সাত রঙের চা পাওয়া যায় নীলকণ্ঠ টি ক্যাবিনে। শ্রীমঙ্গলের বিজিবি কার্যালয়ের পাশে খোলা আকাশের নিচে নির্মাণ করা হয়েছে এই চায়ের দোকান। সঙ্গে ফুচকা বা চটপটি পাওয়া যায়। তবে চা চা পাবেন প্রায় ২০ প্রকারের।

বধ্যভূমি ক্যান্টিন
বিজিবি কার্যালয়ের অপর প্রান্তে আছে শ্রীমঙ্গল জেলার মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি। তার পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি ক্যান্টিন। রাত্রে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা বধ্যভূমির পাশে আপনি চা, কফি কিংবা হালকা নাস্তা করতে পারবেন এই ক্যান্টিনে। দিনের বেলা বধ্যভূমিতে গেলে আপনি ঘুরে দেখতে পারবেন এই এলাকার ভিতর ও বাইরের জায়গাগুলো, যা দেখাশোনা করে বিজিবি।

- কাজী মাহদী আমিন