রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিনোদন / হুমায়ূন আহমেদ-এর 'কৃষ্ণপক্ষ'
০৩/১৬/২০১৬

হুমায়ূন আহমেদ-এর 'কৃষ্ণপক্ষ'

- নাবীল অনুসূর্য

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ বেশ গুরুত্বপূর্র্ণ, বিশেষত নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে দুই হাজারের শুরুর দশকে। এ-সময়ে তার কিছ ুজনপ্রিয় উপন্যাস থেকে বেশ কিছু দর্শকনন্দিত সিনেমা উপহার দেন তিনি। এর বাইরেও তার উপন্যাস থেকে বেশ কিছু সিনেমা হয়েছে। ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘নন্দিত নরকে’, ‘নিরন্তর’ (জনম জনম) - সিনেমাগুলো বেশ প্রশংসিতও হয়। ২০১২ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন তার উপন্যাস নিয়ে কাজ করেনি কেউ। চারবছর পর আবার তার উপন্যাস নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা-‘কৃষ্ণপক্ষ’। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। একই নামের ইমপ্রেস প্রযোজিত সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। চেষ্টা করেছেন যতোটা সম্ভব হুমায়ূন আহমেদের ধাঁচেই ছবিটি নির্মাণ করতে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলায় লেখালেখির ক্ষেত্রে স্বকীয় একটি ঘরানা নির্মাণ করেছিলেন। অবশ্য সেই ঘরানার ভালো-মন্দ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। লেখালেখির মতো বাংলাদেশের সিনেমার ক্ষেত্রেও তিনি তার স্বকীয়তার ছোঁয়া অনেকখানিই আনতে পেরেছিলেন। তার লেখালেখির মূল প্রবণতাগুলোর ছোঁয়া আছে সিনেমাগুলোতেও। যেহেতু কৃষ্ণপক্ষ সিনেমাটি বানানো হয়েছে তার একই নামের উপন্যাসটি থেকে, এবং মানুষের কাছে সিনেমাটির আবেদন মূলত হুমায়ূনের রচনার কারণে, এবং যেহেত ুনির্মাণে-প্রচারণায় এই বিষয়টি খুব করেই বিবেচনায় রাখা হয়েছে, কাজেই সিনেমাটির বিচারে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।

সিনেমাটির আখ্যানভাগ নিয়ে নতুন করে কিছুই বলার নেই। হুমায়ূনের বিরুদ্ধে অনেকেরই অনেক অভিযোগ থাকলেও, তার কাহিনি নির্মাণ ক্ষমতা নিয়ে, অন্তত তার লেখকজীবনের প্রথম পর্যায়ের রচনাগুলোর বিরুদ্ধে কেউই এ প্রশ্ন উত্থাপন করে না। বরঞ্চ সিনেমাটির বিচারে মূল বিবেচ্য হতে পারে, সিনেমাটিতে এই আখ্যানের কতখানি যথার্থ রূপায়ণ করা গেছে। সেক্ষেত্রে নির্মাতার সামনে মূলবাধা ছিল তিনটি - ১৯৯২ সালেরএকটি উপন্যাসকে ২০১৬ সালের পটভূমিকায় নিয়ে আসা, হুমায়ূনের মূল প্রবণতাগুলো ধারণ করা এবং প্রয়োজনীয় সিনেমাটিক ট্রিটমেন্টের সফল প্রয়োগ ঘটানো।

তারও আগে জরুরি উপন্যাসটিকে চিত্রনাট্যে রূপ দেয়া। আর তা করতে গিয়ে উপন্যাসের ঘটনা-বয়ানের ক্রমকে খানিকটা বদলাতে হয়েছে। সঙ্গতভাবেই কিছু অংশের বয়ানের ঢং-ও বদলানো হয়েছে। সংযোজন করা হয়েছে জেবার বিয়ে এবং তার সংসারের উপকাহিনি। সিনেমায় মুহিবের জীবনের সংকট ফুটিয়ে তুলতে এই সংযোজনটা জরুরি ছিল। আবার সিনেমাটিক আবহ ধরে রাখতে গিয়ে উপন্যাসের শেষের পরিশিষ্ট ধরনের যে অংশটুকু রয়েছে, তাও পরিত্যাগ করা হয়েছে। বাদ দেয়া হয়েছে বিয়ের হলুদ কটকটে পাঞ্জাবি পোড়ানোর প্রসঙ্গটাও; যেহেতু পরিশিষ্ট ধরনের অংশটি বাদ দেয়া হয়েছে, এবং এই প্রসঙ্গটি ওই অংশের বিপরীতেই প্রাসঙ্গিক ছিল। মোটের উপর এই পরিবর্তনগুলো মন্দ হয়নি। এবং সঙ্গত কারণেই চিত্রনাট্য তৈরি করার সময় উপন্যাসে বিবৃত সংলাপগুলোকে যথাসম্ভব জায়গা করে দেয়া হয়েছে।

এখন সিনেমাটি নির্মাণে প্রথম বাধাটি, যেটাকে উপন্যাস ও সিনেমার সমসাময়িকতার দ্বন্দ্ব বা সময়গত পার্থক্য বলা যেতে পারে, সেটাতে বেশ ভালোভাবেই পার পাওয়া গেছে। সিনেমাটি দেখতে গিয়ে দর্শকদের কাহিনিতে প্রবেশ করতে খুব একটা সমস্যা হয়েছে বলে মনে হয় না। ডিটেইলিংয়েও এই সমস্যা কিছু ক্ষেত্রে এড়ানো গেছে। ২০১৬ সালের দর্শকদের কথা বিবেচনায় এনে মিরুর স্বামীর চিঠির প্রসঙ্গ বাদ দেয়া, ২০ টাকার নোটকে ১০০ টাকার নোট বানানো, ৬-৭ হাজার টাকার বেতনকে ২০-২৫ হাজার টাকা করা, চরিত্রদের হাতে সেলফোন তুলে দেয়ার মতো খুঁটিনাটি বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সেই সাথে বিদেশে অবস্থানরত স্বামীর সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে ল্যান্ডফোন ব্যবহার না করে নতুন প্রযুক্তিও হয়ত ব্যবহার করা যেত। তার কৃপণতা তার ফোন না-করার বদলে অন্য কোনোভাবেও বোঝানো যেত।

সিনেমাটি মূল উপন্যাসের প্রতি যথেষ্ট অনুগত থাকায়, হুমায়ূনের সাধারণ প্রবণতাগুলোতেও তেমন বড় ধরনের ব্যাত্যয় ঘটেনি। তবে উপন্যাসটি থেকে কিছু বিষয়বাদ দেয়া হয়েছে, যেগুলোও হুমায়ূনের প্রবণতারই প্রকাশ। যেমন, বাসর নিয়ে বন্ধু-পতœীর অশ্লীল ঠাট্টা। চরিত্রায়নেও যেন মাঝে-মধ্যে মৃদুস্খলন ঘটেছে। উপন্যাসের বয়ানে অরুর প্রতিই যেন ঝোঁক ছিল বেশি, সিনেমায় সে ঝোঁকটা পরেছে মুহিবের উপর। শফিকুর রহমানের চরিত্রটিতে মদ্যপান যোগ করা হয়েছে, যেটা উপন্যাসে ছিল না। সাধারণীকৃত ধারণা হলো, সিনেমায় মদ খাওয়া চরিত্রটির নেতিবাচক সত্তার প্রকাশ। অথচ হুমায়ূন চরিত্রটির বর্ণনায় অনেক বেশি নিস্পৃহ ছিলেন। সংলাপের বাইরে তিনি চরিত্রটিকে খল হিসেবে বর্ণনা করেননি। আবরার চৌধুরীকে উপন্যাসে নিপাট ভদ্র ছেলে হিসেবে দেখানো হয়েছে। সিনেমাতেও সে যথেষ্ট ভদ্র ছেলে। তবে বেশ কয়েকবারই তাকে অরুর দিকে খলনায়কোচিত কটমট চোখে তাকাতে দেখা গেছে, যে এক্সপ্রেশন উপন্যাসের আবরারের সঙ্গে মেলে না।

তৃতীয় বিবেচ্য, অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট যুক্ত করার ক্ষেত্রেও সাফল্যের পরিমাণ নিতান্ত কম নয়। পুরো সিনেমাতে সবচেয়ে জরুরি ছিল একদম শেষ দৃশ্যের ট্রিটমেন্টটি, যখন মুহিবের মৃত্যুশয্যার পাশে বসে অরু আবেগঘন কণ্ঠে নানা কথা বলতে থাকে। এখানে হুমায়ূন যে চিত্রকল্পটি ব্যবহার করেছিলেন, তার রূপায়ণে সিনেমায় যে ট্রিটমেন্টটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা বেশ ভালোই হয়েছে বলতে হবে।

হুমায়ূন আহমেদের সিনেমা কতটুকু হয়েছে - এই বিবেচনার বাইরে, কেবল সিনেমা হিসেবে যদি কৃষ্ণপক্ষকে বিচার করতে হয়, তাহলেও সিনেমাটিকে নিতান্ত কম নম্বর দেয়া যাবে না। তবে বেশ কিছু অসঙ্গতি চোখে পরে। প্রথমত, মুহিব এবং আবরারের চরিত্র দুটির যে বয়স, সেই তুলনায় অভিনেতা রিয়াজ এবং ফেরদৌসের বয়স সম্ভবত একটু বেশিই হয়ে গেছে। বিশেষত রিয়াজের চেহারায় বয়সের ছাপ বেশ প্রকটভাবেই দেখা গেছে। বাঁচোয়া যে, তাদের অভিনয় নিতান্ত মন্দ হয়নি। বিশেষত তারা আগেও হুমায়ূনের সঙ্গে কাজ করায়, তাদের এবং দর্শকদেরÑ দপক্ষেরই এ বিষয়ে পূর্বাভিজ্ঞতা থাকায় মানিয়ে নেয়া গেছে।

সিনেমাটোগ্রাফি বেশ ভালো হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আরেকটু পরিমিতিবোধ প্রদর্শন করা যেত। বিশেষ করে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ক্রেনের যথেচ্ছ ব্যবহারে। লোকেশন বাছাই ভালো হয়েছে, কেবল হাসপাতালটি ব্যতিক্রম। উপন্যাসে হুমায়ূন সমসাময়িক বিচারে মুহিবের জন্য হাসপাতাল বাছাই করেছিলেন ঢাকা মেডিকেল। সেটা কেন সিনেমায় রেলওয়ে হাসপাতাল হলো, সে এক রহস্য। সিনেমার সমসাময়িকতার হিসেবে, একজন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এমডির শ্যালকের জন্য অ্যাপোলো-স্কয়ার-ইউনাইটেড, নিদেন পক্ষে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বাছাই করা দরকার ছিল। আর তা নইলে ঢাকা মেডিকেলই রাখা যেত।

কোরিওগ্রাফি মন্দ হয়নি। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যের কোরিওগ্রাফি দৃষ্টিগ্রাহী। ভালো হয়েছে গানের ব্যবহারও। গানের ক্ষেত্রেও হুমায়ূনের অনুগত থাকা গেছে। ব্যবহার করা হয়েছে, হুমায়ূন রচিত দুটি এবং হুমায়ূনের পছন্দের একটি রবীন্দ্রসংগীত। তবে সিনেমার শেষ দিকে কন্টিনিউয়িটিতে খানিকটা গোলমাল হয়ে গেছে। শহর জুড়ে যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ার কথা, তখন হাসপাতালে বৃষ্টি হলেও, শফিকুর রহমানের বাসায় বৃষ্টি হচ্ছিল না। আবার হাসপাতালের একদিকে যখন বৃষ্টি হচ্ছিল, হচ্ছিল না অন্যদিকে। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের সিনেমায় বৃষ্টির প্রতি একটু বেশিই মনোযোগ দেয়া উচিত, যেহেতু বাংলাদেশি মধ্যবিত্তের বৃষ্টিবিলাসের অন্যতম প্রভাবক এই হুমায়ূন আহমেদ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হুমায়ূনের ‘কৃষ্ণপক্ষ’ থেকে সিনেমা ‘কৃষ্ণপক্ষ’ নিতান্ত মন্দ হয়নি। সেজন্য পরিচালক লেখকের প্রতি যথেষ্ট অনুগত থাকারও চেষ্টা করেছেন। এমনকি সিনেমার কুশীলব ও কলাকুশলী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও অনুগত থেকেছেন হুমায়ূনের প্রতি। ফলাফল তাই ভালোই হয়েছে। তাতে অন্তত হলে গিয়ে দর্শকরা হুমায়ূনের সিনেমা দেখার মতোই খানিকটা অনুভূতি পাবেন।