শুক্রবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / সইতে নারি কইতে পারি
০৩/১৬/২০১৬

সইতে নারি কইতে পারি

- মোজাফ্ফর হোসেন

লেখক : পূরবী বসু
প্রচ্ছদ : কাইয়ুম চৌধুরী
প্রকাশক : অন্য প্রকাশ।
মূল্য : ২৫০টাকা
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬-তে বিষয়বিচারে যে কটি ভিন্ন ধরনের বই এসেছে, তার মধ্যে অতি উল্লেখযোগ্য হল ‘সইতে নারি কইতে পারি’। লেখক পূরবী বসু। বইটি প্রবন্ধ-বই না, গল্প-উপন্যাসও না। ঠিক কবিতার বইও বলা চলে না, তবে পাঠক এটিকে কবিতার একটি আলাদা ফর্ম হিসেবে দেখতে পারেন। বিষয় এবং আঙ্গিকে এটিকে আমরা বারমাস্যা বা বারোমাসি রীতির কাব্যকথা বলতে পারি। মোটা কথায়, বারমাস্যা হল বিরহিণী নারীর এক বৎসর ব্যাপী দুঃখের কাহিনি নিয়ে রচিত কবিতা। মধ্যযুগের লোকসাহিত্যে স্বামীর অনুপস্থিতে স্ত্রী সংসারে সতীন-শাশুড়ি-ননদের অসৎ ও অন্যায় আচরণের বর্ণনা তুলে ধরতেন সখির কাছে। খুব সরল সহজ ভঙ্গি, একেবারে কথ্যভাষায়, এটিই হল বারোমাসির আদিরূপ। মঙ্গলকাব্যের নরখন্ডে এটি আছে।

এই বইতে কথাসাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক পূরবী বসুকে আমরা কবি হিসেবে পাচ্ছি। তিনি কবিতার শৃঙ্খল কাঠামো না ব্যবহার করে যতটা সম্ভব বারোমাস্যার বিন্যাসরীতি ব্যবহার করতে চেয়েছেন। অর্থাৎ অতি সরল প্রচলিত শব্দের ছন্দময় বিন্যাসে তিনি নারীর আত্মকথন তুলে ধরেছেন। নাট্যসাহিত্যে আমরা যাকে ড্রামাটিক মনোলগ বলি অনেকটা সেইরকম। উপস্থিত একজন শ্রোতাকে কল্পনা করে নিয়ে সংসারে নিজের দুঃখভরা জীবন তুলে ধরছেন একজন নারী।

একটা উদাহরণ দিই : স্বামী স্ত্রীকে বাড়ির মধ্যে বন্দি রাখে তার মন্ত্র পড়িয়ে। সে জগত নিয়ে ব্যস্ত। যাতে স্ত্রী বিদ্রোহ করে ঘর বাহির না করে, সেই জন্যে সে কৌশলে স্ত্রীকে বোঝায়। স্ত্রী সেটা বুঝে মনে কথা তুলে ধরেন :
[...] আমার সংসার, আমার বাড়ি
আগলে রাখি, যেমন পারি।
সব দেখে তাই বলে স্বামী,
‘তুমিই চালাও, চলি আমি।
তোমার মেধা, প্রজ্ঞা, স্বভাব
তল্লাটে আজ বড়ই অভাব।
বিশাল যত ব্যাপার-স্যাপার
দেখার তো ভার সবই তোমার।
আমি আবার অন্যরকম
বৃহৎ কাজে নাক গলাই কম।
ছোটখাটো বিষয় ছাড়া
গা করি না; দেই না বারা।
শুনে কেবল ভাবি আমি,
কোথায় পাব এমন স্বামী!
কার অধিকার আমার মতো?
বাড়ির কর্ত্রী, শক্তি কত!
এবার পূরবী বসুকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পাঠসম্পর্কিত দুচারটি কথা বলি। আমরা জানি তিনি বিজ্ঞান মনস্ক প্রাবন্ধিক, বিশ্লেষক এবং কথাসাহিত্যিক। বাংলাদেশে নারীজীবন বা নারীর মানবিক অধিকারের বিষয়টি এতদিন পুরুষদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে বেশি। সৃজনশীল নারীরা মোটের উপর কবিতা-কথাসাহিত্য রচনা করেছেন। বিশেষ করে কথাসাহিত্যে নারীর অধিকার নিয়ে তাঁরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন এবং রেখে চলেছেন। আর মননশীল জায়গাতে এসে আমরা বেগম রোকেয়ার পরে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজনকে পেয়েছি। এক্ষেত্রে তাঁদেরই উত্তরসূরি পূরবী বসু। তবে হ্যাঁ, নারীর অধিকার বা নারীস্বাধীনতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি নারীরা কাজ করেছেন গবেষণায়। বিশেষ করে বর্তমানে জেন্ডার বিষয়ে অনেক নারী গবেষণা করছেন। আমার মনে হয়, জেন্ডার ইস্যুতে সবচেয়ে অথেনটিক হতে পারে একজন নারীর দৃষ্টিভঙ্গী। কানাডার কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউড বলেছিলেন, নারীবিষয়ে আমি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বা ন্যারেটিভকে বিশ্বাস করি না। এই কথাটিই আরো ব্যাপক অর্থে বলেছেন চিপিউয়া এলডাল: When other people tell you story, it always come out crooked. শুধু এই কারণে না, পূরবী বসুর লেখাকে গুরুত্ব দেয়ার আরো একটি কারণ হলো, তিনি নিজে নারী হলেও যখন লেখেন তখন তিনি কোনো আবেগ দিয়ে লেখেন না। অর্থাৎ সেটি আলাদা করে নারীর গদ্য বলে চিহ্নিত করার প্রয়োজন পড়ে না। বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ বলে এটি সম্ভব হয়েছে।