শনিবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / রক্তসূত্র
০৩/১৬/২০১৬

রক্তসূত্র

- জয়দীপ দে

রক্তের ব্যাপারে আমি খুব খুঁতখুঁতে। সতর্ক। যেদিন থেকে জেনেছি আমার রক্তের গ্রুপ, সেদিন থেকেই। সেদিন থেকেই মনে মনে ধরে নিয়েছি আমার মৃত্যুটা হবে এই রক্তের কারণে। কুষ্ঠিতে স্পষ্ট লেখা আছে অপঘাতে প্রাণনাশ। আমার মৃত্যুর দৃশ্যগুলো মাঝে মাঝে আমার চোখের উপর ভাসে। অপঘাতের পর হবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। ডাক্তার বলবে, কুইক ব্লাড। আমার আত্মীয়-স্বজনরা কোথাও আমার গ্রুপের রক্ত পাবে না। রক্ত খুঁজতে খুঁজতেই ডাক্তারের হাতের মুঠো থেকে ঝরে পড়বে আমার নিস্তেজ হাত। কান্নার রোল উঠবে একটু পরই।
তাই নিজের শরীরের মহামূল্যবান রক্ত সর্বদা আগলে রাখি। সাপ্তাহে একবার দু’মুঠো লাল শাখ কিনে আনি। মাঝে মাঝে কলার থোড়; বুগলি। আয়রন দরকার। যত আয়রন তত রক্ত। এতে রক্ত হয় কিনা বলতে পারব না, তবে শরীর হয় না। মেশিনে দাঁড়ালে দেখি কাঁটাটা পঞ্চাশের ঘরে আছাড় পিছাড় খায়। কোনো মতে এই লক্ষণরেখা পেরুতে নারাজ। মানে স্পষ্টতই আমি আন্ডারওয়েট। রক্তক্ষরণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রবল। তাই রক্তের ব্যাপারে আরো মনোযোগী হই। আঙুল কেটে গেলে স্যাভলন দেয়ার আগে ঠোঁট লাগিয়ে রক্ত চুষে নেই। এতোটুকুই বা নষ্ট হবে কেনো। এভাবে রক্ত বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে বেঁচে আছি।
মাঝে মাঝে খবর পাই রক্তের জন্য লোকজনকে কিডন্যাপ করে ফেলা হচ্ছে। সারা শরীরের রক্ত ছেঁকে নিয়ে ক্যান বা পলিপ্যাকের মতো ফেলে দিচ্ছে রাস্তায়। ভয়ের একটা পাথর চেপে বসে বুকের ভেতরে। নিজের শরীরটাকে অবিশ্বাস্য রকম ভয় হয় নিজের। এই রক্তই কি তবে ডেকে নিয়ে আসবে অনাগত ঘাতককে। সে আতংকে কোথাও নিজের সত্যিকারের রক্তের গ্রুপ লিখি না। একেক জায়গায় একেক তথ্য। কলেজের আইডি কার্ড, ন্যাশনাল আইডি কার্ড কিংবা পাসপোর্ট- ভিন্ন ভিন্ন তথ্যে ভরা। শুধু কাছের কিছু মানুষ জানে ব্যাপারটা।
তাদের একজন চৈতি। আরে, তার পাগলামিতেই তো সেবার বইমেলাতে ব্লাড টেস্ট করানো। দুটো ছোট্ট কাচের টুকরোয় দু ফোঁটা রক্ত রেখে কয়েক ফোঁটা রি-এজেন্ট দিল। অনেকক্ষণ ধরে কোনো প্রকার পরিবর্তন হলো না রক্তের। তারপর টেকনিশিয়ান ছেলেটা হেসে আমার রক্তের গ্রুপ জানালো। ওমা, চৈতির সেকি চিৎকার!
এই জন্যই তো তুই এতো হিংসুটে। সারাদিন বক বক করিস।
রক্তের গ্রুপের সাথে হিংসা আর কথা বলার কি সম্পর্ক!
আছে আছে।
চৈতির কথাকে সত্য ধরে নিয়ে কয়েকদিন খুব হীন্মন্যতায় ভুগেছিলাম। কি বিশ্রিরকম খারাপ একটা রক্তের গ্রুপ আমার। বাজে বাজে সব ক্যারেকটিস। তখনও রক্ত তথা শরীর নিয়ে এতো সচেতন হয়ে উঠি নি। মেঘের ওপর যে স্বপ্নের একটা দেশ আছে, সেখানে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। মাটির ধরণীর ধুলি-ময়লা তখনো আমাকে স্পর্শ করে নি। চৈতি নামের একটা ছটফটে মেয়ে আমার সারাটা অস্তিত্ব জুড়ে ছিল। ও বললে সব করতে পারতাম। শরীরে যে লিটার চারেক রক্ত আছে তা একটা পেট্রলের জারে ভরে হাসি মুখে তার পায়ের কাছে এনে রাখতেও। তখন বেঁচে থাকার একটাই মানে ছিল- চৈতি। কোনো রক্ত ফক্ত নয়। দুষ্প্রাপ্যতার আশংকাও নয়। নইলে ব্লেড দিয়ে আমার রগ-ভাসা শীর্ণ হাত চিড়ে কি করে লিখে ফেলি তার নাম!
চৈতি চলে গেছে। প্রাপ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই সে দুষ্প্রাপ্য নয়, অপ্রাপ্য। আছে আমার দুষ্প্রাপ্য রক্ত। তাকে নিয়েই তাই ব্যস্ত থাকি সারাক্ষণ। বুঝি চৈতি ছিল ভুলে ভরা এক অভিধানের নাম। সব উল্টা পাল্টা কথা গেঁথে দিয়ে গেছে আমার মাথার ভেতরে। রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মানুষের চরিত্রের মিল থাকা অসম্ভব। ল্যান্ডস্টেইনার সাহেব রক্তের গ্রুপগুলো ভাগ করেছেন লোকের চাল চলন দেখে নয়; বরং শ্বেতকণিকায় এন্টিবডি এবং এ্যান্টিজোনের উপস্থিতির ভিত্তিতে। বরকত খারাপ, আমার রক্তে ওই দুই বস্তুর একটাও নাই। তাই ডবল গোল্লা। এরজন্য শরীর দুর্বল ও শীর্ণ হতে পারে। তাই বলে হিংসুটে বা বাচাল হবো কেন! কিছু যদি প্রগলভতা দেখিয়ে ফেলি, কিছুটা হিংসুটেপনা- সেটা নিতান্ত তার আমার ব্যাপার। ভালো লাগার ব্যাপার। এর মধ্যে নিরীহ রক্ত বেচারাকে ডেকে আনার কোনো মানে হয় না। চৈতির অনুপস্থিতিতে যুক্তির গেরোগুলো খুলছে। সে যতদিন ছিল লজিকের সবগুলো গেট-ভাল্ব তার হাতেই ছিল। স্বাধীন ভাবনার ফুসরতই বা ছিল কই। আজ ওকে কাছে পেলে মুখের ওপর কট কট করে বলে দিতাম, এসব আর কিছু না, প্রপাগন্ডা। সংখ্যালঘুর ওপর সংখ্যাগুরুর চালানো প্রপাগন্ডা। জানো মাত্র সিক্স পারসেন্ট লোক নেগেটিভ রক্তের হয়। আমার মতো ডবল গোল্লা তো আরো কম।
হুট করে চৈতির প্রসঙ্গ আসায় সব এলোমেলো হয়ে গেলো। চৈতি আসলে একটা ঘুর্ণি হওয়ার মতো ছিল আমার জীবনে। খুব অল্প সময়ের জন্য এসে সব ল-ভ- করে চলে গিয়েছিল। ঝড় থেমে গেলে সুবাতাস বয়। মানুষ ধীরে ধীরে ধ্বস্ত ভিটার পর জীবনের ভিত গাড়ে। আমিও ব্যতিক্রম নই। ফিরে আসি প্রসঙ্গে।
রক্ত নিয়ে আমার এতো লুকোচুরিও কি করে যেন ফাঁস হয়ে যায়। প্রায় ফোন আসে। ভাই আপনি ওমুক বলছেন। জি। আমার বোনের জন্য এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। খুব আর্জেন্ট।
বিচলিত হয়ে ওঠি। কী করে লোকে জানে এসব। পিছলে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজি।
আচ্ছা, আপনার পেশেন্ট কোথায় আছে?
ও। আমি তো ভাই চাটগাঁ নাই। একটা অফিসিয়াল ট্যুরে বেরিয়েছি।
ভদ্রলোক দুঃখিত ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দেন।
এভাবে বোনের জন্য রক্ত, বাচ্চার জন্য রক্ত, ভাইয়ের জন্য রক্ত, মায়ের জন্য রক্ত... শুধু রক্ত আর রক্তের দাবি চতুর্দিকে। আমি সুকৌশলে এই ওই বলে সব এড়িয়ে যাই। আমার শরীরের মহামূল্যবান রক্ত কাউকে দেয়ার পক্ষপাতী নই আমি। এমনকি একবার আমার ফুফাতো বোনের রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। খুব অর্ডিনারি ব্লাড গ্রুপ। লোকে যাকে গরুর রক্ত বলে। সেই রক্তই পাওয়া যাচ্ছিল না কোথাও। শেষমেশ মিলল সন্ধানীতে। কিন্তু এক ব্যাগ রক্তের বিনিময়ে আরেক ব্যাগ দিয়ে যেতে হবে। সে তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শেষমেশ এক স্বল্প পরিচিত ছেলেকে ধরে সমস্যার সুরহা হলো।
কিন্তু কিছু মানুষ আছে তাদেরকে ছুঁতো দিয়েও রক্ষা নেই। কিছুদিন পর পর ফোন করবে। অনেকের তো ফোন নম্বরই আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বেশি যন্ত্রণা করে ব্লাড ডোনারস এসোসিয়েশনের কিছু ছেলে-ছোকড়া। দাদা প্লিজ এক ব্যাগ... বাচ্চাটা নইলে বাঁচবে না।
অসহিষ্ণু হয়ে ওঠি, আরে ভাই বললাম না কিছু দিন আগে দু ব্যাগ দিয়েছি। এ মুহূর্তে ...
ও প্রান্ত থেকে ছেলেটির কণ্ঠ আরো চওড়া হয়, হেগে মুতে রক্ত নষ্ট করবে, মানুষকে দিবে না। কঞ্জুসের বাচ্চা।
আমি হাসি হাসি মুখে লাইনটা কেটে দেই। আমার রক্ত আমি যা ইচ্ছে তাই করব তোর বাপের কি?
তবে কিছু কিছু মানুষের অনুরোধ শুনলে মনটা একেবারে গলে যায়। বিশেষ করে কিছু দিন পর পর লিউকেমিয়া আর থ্যালাসিমিয়ার পেশেন্টদের বাবা বা মা’রা ফোন করে। খুব কাকুতি মিনতি করে। নিজেরই কান্না পেয়ে যায়। তার পরও নিজেকে শক্ত রাখি। এড়িয়ে যাই বিভিন্ন বাহানায়।
এর মধ্যে এক ভদ্রলোক নিয়ম করেই কিছুদিন পর পর ফোন করতেন। খুব মিষ্টি কণ্ঠ। কণ্ঠেই আভিজাত্যের প্রকাশ আছে। আলাপ হতো খুব সংক্ষিপ্ত। যখনই বলতাম আমার পক্ষে এখন দেয়া সম্ভব নয়, তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দিতেন। এতবার না করার পরও ফোন করতেন। বিনয়ের একটা শক্তি আছে। সেই শক্তি একসময় আমাকে দুর্বল করে ফেলে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই সেই ভদ্রলোকের মেয়েকে রক্ত দিয়েই না হয় শুরু করব আমার রক্তদানের ইতিহাস। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, সিদ্ধান্ত নেয়ার পর আর কোনো দিনই তিনি ফোন করেননি। ফলে আমার রক্ত বিলানোর ইচ্ছেটা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
শুরু যখন হলো না, একদিকে ভালোই হয়েছে। পনের কোটি মানুষের দেশে রক্ত দেয়ার মানুষের কি অভাব আছে। কত মানুষ মেডিকেলের বারেন্দায় রক্ত বেচার জন্য ঘুর ঘুর করছে। তাদেরকে গিয়ে ধরো। আমার মতো একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখককে নিয়ে টানাহেঁচড়া কেন। আজ যদি আমি দুম করে মরে যাই, আমার অসমাপ্ত কাজগুলো কে করে দেবে? আমাদের মতো লোকরা যত বাঁচবে ততই দেশের মঙ্গল। তত বেশি সৃষ্টিকর্ম রেখে যাবে ভবিষ্যতের জন্য। আর উল্টাপাল্টা জিন নিয়ে জন্মানো বাচ্চাগুলো নিয়ে এতো মায়াকান্নার কি আছে। প্রকৃতি যেখানে তাদের প্রতি বিরূপ, আমি আপনি কিবা করতে পারি। হুম, রক্ত দিয়ে কিছু দিনের জন্য হয়ত মৃত্যুটা ঠেকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু শেষমেষ তো অকালমৃত্যু তার কপালে আছেই। মধ্যে ইমোশনাল হয়ে কিছু রক্তের অপচয়। তাই রক্ত দেই নি, দিবোও না ঠিক করে রেখেছি।
যাই হোক রক্ত নিয়ে অনেক আলাপ হলো। এবার আমার সৃজনশীলতার চর্চা নিয়ে দু’টো কথা বলি। অল্পদিনে আমি লেখালেখিতে বেশ করেছি। লোকাল পেপারগুলোর পাতা জুড়ে আমার গল্প প্রবন্ধ ছাপা হয়। লোকজনে ফোন করে প্রতিক্রিয়া জানায়। পাড়ায় ছোট বড়ো সব অনুষ্ঠানে আমাকে গেস্ট করা হয়। মাঝে মাঝে জেলা পরিষদের অডিটরিয়ামে সেমিনার হয়। সেখানে আলোচক হই। লোকের কথার ভুল ধরি। চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলি। বেশ উপভোগ করি ব্যাপারগুলো। পত্রিকায় আমার বক্তৃতার ছবি আসে। নাম আসে।
এই নাম-ছবির বদৌলতেই আবার চৈতির সঙ্গে যোগাযোগ।
একদিন ওই ফোন করল।
কোথায় পেলে নম্বর?
কেন, এ শহরে তোমার নম্বর পাওয়া কি খুব কঠিন বিষয়?
তুমি কি চট্টগ্রামেই আছো।
হুম।
ওমা, আমি তো জানি বিয়ের পরপরই...
হ্যাঁ স্টেইটসে ছিলাম কিছুদিন। পারিবারিক কারণেই চলে আসতে হলো।
সেদিন ফোনে অনেক আলাপ হলো চৈতির সঙ্গে। বুকের ভেতরে অনেকদিন পর টনটনে একটা ব্যথা অনুভব করলাম। মনে হলো আমারই লেখা চিত্রকল্পে আরেক পুরুষকে নিয়ে সংসার করছে চৈতি। কী অবিশ্বাস্য প্রতারণা। চৈতির ফোনের উদ্দেশ্য ছিল, একটা অনুষ্ঠানে আমাকে গেস্ট করা। হসপিটালের ফান্ড কালেকশনের অনুষ্ঠান। এই হসপিটালটি করার জন্য সে আমার সার্বিক সহযোগিতা চাইল। মনে মনে বললাম, চাইবার কি আছে, আদেশ করুন মহারানি। দেখুন আপনার জন্য আমি কি করতে পারি।
চৈতির ফোন পাওয়ার পর থেকে জীবনটা আবার অন্যরূপে এসে ধরা দিতে লাগে। পথে যেতে যেতে কোনো সমবয়সি নারীকে দেখলে ভাবি, আহারে এই তো আমার বউ হতে পারত। তিন চার বছরের কোনো বাচ্চা দেখলে ভাবি...। রক্ত থেকে ভাবনা ঘুরে গেল রক্তসূত্রের দিকে। ইশ, একটা রক্তের সেতু গড়তে পারলাম না কোনো মানবীর সাথে। আমার রক্তের প্রবাহ আর বইবে না প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
আক্ষেপে পুড়ি আর প্রতীক্ষার প্রহর গুনি।
যেদিন আবার দেখা হলো চৈতির সঙ্গে কনফারেন্স হলের হল্লা, খাবারের গন্ধ, আলোর রোশনাই সব উপেক্ষা করে চৈতিকেই পেয়ে বসেছিল আমার সর্বেন্দ্রিয়। ও ফিস ফিস করে বলল, একটু স্বাস্থ্য হয়েছে। ভালোই লাগছে দেখতে।
দামী বস্ত্র আর প্রসাধনের চাপায় আধমরা চৈতিকে নিয়ে তখনই ছুটে পালাতে ইচ্ছে হচ্ছিল আমার। চৈতি তার নীল পাথরের আংটি পরা আঙুল দিয়ে ইশারা করল আমাকে। কাছে আসতেই খপ করে ধরে নিয়ে ছুটতে লাগল। যেন আমার মনের ভাষা ও পড়ে ফেলেছে।
চুপচাপ এখানে বসো। এখনোই অনুষ্ঠান শুরু হবে।
আমি অনুগত ছাত্রের মতো বসে পড়লাম চেয়ারে। চৈতি আরেকটি চেয়ারে তার পার্সটি রেখে বসে পড়ল আমার পাশে।
ফয়সালের জন্য রাখলাম।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে মঞ্চের পর্দা দুলে উঠল। ব্যাকস্ক্রিনে মিষ্টি একটা বাচ্চার ছবি ভেসে উঠল। উপরে লেখা ফান্ড ক্রিয়েশন সিরেমনি ফর সিনথিয়া মেমোরিয়াল চাইল্ড হসপিটাল। তার পর একজন সুবেশী ভদ্রলোক এলেন। পরে জানলাম ইনি শহরের নামকরা পেডিট্রিশিয়ান। সুন্দর করে তিনি হসপিটালটির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বললেন। জানালেন বিশিষ্ট শিল্পপতি সাকিবুর রহমানের প্রয়াত কন্যা সিনথিয়ার নামে একটা চাইল্ড হসপিটাল স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেখানে থ্যালাসিমিয়া ও লিউকেমিয়া চিকিৎসার বিশেষায়িত সুবিধাদি থাকবে। চমৎকার লাগল ভদ্রলোকের প্রেজেন্টেশন। উনি পেডিট্রিশিয়ান না হলে বাংলার প্রফেসর হতে পারতেন। বেশ মানাত তাকে। এর পর সাকিব সাহেব এলেন। অল্পকথায় গুছিয়ে তার মনের ভাব প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন তার শিশুটি থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত ছিল। এসব রোগের চিকিৎসায় যতটা ঔষধ ও যন্ত্রপাতির সুবিধা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক সমর্থন। ছয় মাস পর পর আমাদের শরীরের রক্ত স্বাভাবিক নিয়মে নষ্ট হয়ে যায়। এটা যদি ছোট্ট ছোট্ট এই বাচ্চাদের জীবন রক্ষায় দান করা যায়, তাহলে অনেক শিশুই বেঁচে যেত। আর লিউকেমিয়া বা থ্যালাসিমিয়া এখন আর প্রাণঘাতী রোগ নয়। এসবের রিকোভারি রেট খুবই ভালো।
এলিটদের আনাগোনায় সরগরম হয়ে উঠেছিল অনুষ্ঠান। বড়ো শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা মঞ্চ উঠে বড়ো অংকের টাকা ডোনেটের প্রতিশ্রুতি দিলেন। অল্পক্ষণের ভেতরে অনেক টাকার ফান্ড হয়ে গেলো। আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল মঞ্চে গিয়ে কিছু অনুদানের ঘোষণা দেই। কিন্তু এতো বড়ো বড়ো প্রতিশ্রুতির পর আমার হাজার খানেক টাকা দানের ঘোষণা শুনে লোকে হাসবে ভেবে আর সাহস হচ্ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মঞ্চ থেকে আমার নাম ভেসে এলো। অনুরোধ করা হলো অনুষ্ঠানটি নিয়ে কিছু মন্তব্য করার। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। থেমে থেমে খুব নান্দনিক ভাষায় রক্তদানের গুরুত্ব বোঝালাম সবাইকে। এবং এ-ও ঘোষণা দিলাম, খুব শীঘ্রই আমি মৃত্যুপথযাত্রী এসব দেবশিশুদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখব। নামও ঠিক করে ফেলেছি, দেবালয়। মুহুর্মুহু তালিতে সবাই স্বাগত জানাল আমাকে। সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানটা শেষ হলো। শুরু হলো ভোজনপর্ব। সিনথিয়ার বাবা সাকিবুর রহমান সব টেবিলে ঘুরে ঘুরে অভ্যাগতদের কুশলাদি জানতে লাগলেন। উনি আমাদের টেবিলের কাছেই আসতেই চৈতি আর্কু হাসি দিয়ে বলল, কেমন বলল আমার দোস্ত।
অসাধারণ। তা পরিচয় করিয়ে দেবে না।
শিওর। ও হচ্ছে ফয়সাল।
তোমার বর!
হুম।
আমি বজ্রাহতের মতো স্থির হয়ে গেলাম। সিনথিয়া তাহলে চৈতির মেয়ে। আমার সাথে চৈতির বিয়ে হলো হয়ত মেয়েটা আমারই হতো। একটা অবুঝ বেদনায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। মঞ্চ থেকে সিনথিয়া আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
কি হলো তোমার-
চৈতির ঝাঁকুনিতে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আবার লৌকিকতার খোলসে ঢুকে পড়ি। হাত বাড়িয়ে দিলাম সাকিবুর রহমান ওরফে ফয়সালের দিকে।
নিজের পরিচয় দিতে উদ্যত হই, আমি...
ভাই আপনাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। ভদ্রলোক মৃদূ হেসে উঠলেন। আভিজাত্যপূর্ণ মিষ্টি গলায় বলে যেতে লাগলেন, আপনাকে কয়েকবার আমি ফোনও করেছিলাম।
কেন! আমি অবাক হলাম।
সিনথিয়ার জন্য। ব্লাডের জন্য।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। নিজের কাছে নিজে এত ছোট বোধহয় কখনো হয়নি। লজ্জ্বা-গ্লানি আর বিব্রতবোধকে কাটাতে তৎপর হয়ে উঠলাম, আরে ভাই ফোনে পরিচয় দেবেন না।
একটা মৃত্যুপথযাত্রী শিশুর জন্য কি পরিচয়ের কোনো প্রয়োজন ছিল?
শান্ত গলায় ভদ্রলোক যেন আমার একগালে একটা কথার চড় বসিয়ে দিলেন।