সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / আপনি কি ওসিডি-তে ভুগছেন?
০৫/১৫/২০১৭

আপনি কি ওসিডি-তে ভুগছেন?

-

অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) একধরনের আচ্ছন্নকারী চিন্তা যেটার ফলাফল দেখা যায় বাধ্যকরণ আচরণের মধ্য দিয়ে। যারা এ সমস্যায় ভোগেন বেশিরভাগই সাধারণত অনিয়ন্ত্রিত, বিপর্যস্ত চিন্তাভাবনা অথবা বিশেষ কোনো কিছুর প্রতি (ধুলা, ময়লা, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি) ভয় থেকে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন বাধ্যতামূলক আচরণ করেন। এটা যে শুধু এই বিশেষ ধরনের কোনো কিছুর প্রতি প্রতিক্রিয়াশীলতাসম্পন্ন আচরণ তা নয়, অকারণ খুঁতখুঁতে ভাবও এ সমস্যার অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তিভেদে শুধু অবসেশন বা কমপালশন অথবা উভয়ই থাকতে পারে। অনেকে সমস্যাটিকে শুচিবায়ুও বলে থাকেন। চলুন দেখে নিই এ রোগের লক্ষণগুলো কি কি।

লক্ষণ
- সংক্রমণ এবং ধুলা-ময়লা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ এবং আচ্ছন্নতা বা দুর্ঘটনাবশত কোনো খারাপ কিছু করে ফেলা নিয়ে দুশ্চিন্তা।

- গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু ভুলে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা।

- সামাজিকভাবে বিব্রতবোধ করা নিয়ে ভয় বা অনাহূত চিন্তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা।

- একই ধরনের চিন্তা, অনুভূতি বা অবয়ব বারবার মনের মধ্যে আসতে থাকা এবং এসব চিন্তা, অনুভূতি বা অবয়বকে দমন করতে চাওয়ার জন্য একই কাজ বারবার করতে থাকা।

- শরীর নোংরা হওয়ার ভয়, অহেতুক সন্দেহ, কোনো অমূলক শারীরিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা, সবকিছুর মধ্যে নিখুঁত সামঞ্জস্য তৈরি করার ভাবনা, বিনা কারণে উত্তেজিত হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত যৌনচিন্তা হওয়া ইত্যাদি।

- এছাড়াও কম্পালশনের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে- বারবার একই জিনিস পরীক্ষা করা (দরজা বন্ধ কিনা তা অনেকবার দেখা), অসংখ্যবার হাত ধোয়া, বেশি সময় গোসলে থাকা, কোনো কিছু বারবার গোনা, একই প্রশ্ন বারবার করা, সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করা, প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সবকিছু সংগ্রহে রাখা অর্থাৎ পরে কাজে লাগতে পারে ভেবে নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় বস্তুটিও ফেলে না দেয়া ইত্যাদি। কোথাও বেড়াতে গিয়ে বাথরুম ব্যবহার না করা, ঘুমের সময় মনে হয় গ্যাসের চুলা নেভানো হয়েছে কিনা, দরজাটা বন্ধ করা হয়েছে কিনা এ সবই এই রোগের লক্ষণগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

কারণ
বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৩ ভাগ এই রোগে আক্রান্ত। তবে শতকরা ৮০ ভাগ বুঝতে পারে না যে, এটা একটি মানসিক রোগ। এ সমস্যার পেছনে গবেষকরা নিম্নলিখিত কারণগুলোকে হেতু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

- রোগের পারিবারিক ইতিহাস;

- মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক মাত্রার সেরোটোনিনের উপস্থিতি;

- তীব্র মানসিক চাপ বা দুঃখের কোনো কিছু ঘটলে;

- হতাশা।

চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বলে যে, মৃদু অবসেশন বা কম্পালশন থাকলে চিকিৎসা না নিলেও চলে; তবে এগুলো যদি ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মকান্ডের ওপর প্রভাব ফেলে, অপরের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করে, কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় তবে অবশ্যই চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

চিকিৎসা
অবসেশন-কম্পালশনের জন্য বেশ কিছু চিকিৎসা রয়েছে। মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের তারতম্যের কারণে এ সমস্যা হয় বলে উদ্বেগবিরোধী বা হতাশারোধী ওষুধের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা করা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সেবন করা প্রয়োজন। এসব ওষুধের কিছুটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে এ রোগের চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত আর যেহেতু এক-দুদিনে ফল পাওয়া যাবে না, তাই ধৈর্য ধরে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খেতে হবে।

ওষুধের পাশাপাশি ধারণা ও আচরণ পরিবর্তনকারী চিকিৎসা (কগনিটিভ-বিহেভিয়ার থেরাপি) এ রোগের জন্য বিশেষ কার্যকরী। এ-পদ্ধতির মূলনীতি হচ্ছে ‘এক্সপোজার ও রেসপন্স প্রিভেনশন’। এক্সপোজার পদ্ধতিতে যে বিষয়টি নিয়ে তার খুঁতখুঁতে চিন্তা আছে তাকে সে বিষয়টির মুখোমুখি করতে হবে। যেমন কারও যদি ময়লা-আবর্জনা নিয়ে খুঁতখুঁতে চিন্তা থাকে তবে তাকে ময়লার ঝুড়িতে হাত দেয়ার জন্য বলতে হবে। আর রেসপন্স প্রিভেনশন পদ্ধতিতে যে কাজটি বারবার না করলে সে শান্তি পায় না, সে কাজটি করা থেকে তাকে বিরত রাখতে হবে। যেমন সে বারবার হাত ধোয়, তাকে হাতে ময়লা লাগিয়ে হাত না ধুয়ে বসিয়ে রাখতে হবে খুঁতখুঁতে চিন্তা বন্ধ করার জন্য অন্য কোনো বিকল্প চিন্তা বা আচরণের অভ্যাস করা যেতে পারে- যেমন হাতে একটি রাবার ব্যান্ড লাগিয়ে রাখতে হবে এবং যখনই মনে অবসেসিভ চিন্তাটি আসবে তখনই রাবার ব্যান্ডে টান নিয়ে ছেড়ে দিতে হবে, হাতে মৃদু আঘাত লাগবে; মনের অবসেসিভ চিন্তাটি অন্যদিকে ধাবিত হবে, উৎকণ্ঠা কমে আসবে।

ওসিডি বা অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার রোগের চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ। তবে ধৈর্যহারা না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ সম্ভব।

- রিজবানুল হাসান