রবিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঘরভাঙা ঘর,দ্বিতীয়-পর্ব
০৩/১৬/২০১৬

ঘরভাঙা ঘর,দ্বিতীয়-পর্ব

- রিজিয়া রহমান

ঘরের কোণার মাটির হাঁড়ি থেকে একখুচি চাল এনে ওমরতুনের আঁচলে ঢেলে দিল সোনাবড়–।
ওমরতুনের দন্তহীন মাড়ি হাসিতে উদ্ভাসিত হলো : বুজির আমার দয়ার শরীল। আল্লায় তরে সুখ দিব।
ফকিরচাঁদ এসে মধ্যে দাঁড়াল : ‘নানী, কও তো তোমার জয়নাল খাঁরে ধরিয়া তোমার সামনে আনিয়া ফেলাইয়া দেই। বেইমান। বুড়া দাদি পালছে-লালচে, অহনে কারবার করিয়া বড় মানুষ হইছে। দাদিরে বাড়ির বাইর করছে। দিমু নাকি হুমন্ধির পুতের একদিন...।’
ওমরতুনের চোখ পানিতে ভরে ওঠে।
: ভাইরে। দুঃখু আমায় কপালের। জয়নাইলা তো উছিলা। তা না হইলে বুড়া বয়সে কবরে না গিয়া ঢাকার বাড়ি আমু ক্যান?
ফকিরচাঁদ প্রচ- রবে হেসে ওঠে : হেইয়া কও, নাতির লাইগ্যা বুক টাটায়।
ওমরতুন আঁচলের খুট দিয়ে চোখ মুছল- ‘হরে ভাই, মায়ার টান...।’
ওমরতুন চলে যেতে ফকিরচাঁদ সোনাবড়–র দিকে তাকায় : কি সোনাবিবি, এইবার কার ঘর ভাঙবা?
সোনাবডু কপট ঝামটা দেয় : হেই চিন্তা তোমার ক্যান মিয়া সাব? তোমার তো ঘরই নাই।
ফকিরচাঁদ রসিক দৃষ্টিতে তাকায় : সোনার মতো বিবি পাইলে ঘর তো বানবারও পারি।
সোনাবড়–ও মুচকি হাসে : সোনার খাঁচা না হইলে কি সোনার বিবি আহে!
ফকিরচাঁদও হাসে : আনবার জানি আমি।
সোনারবড়– একটা কটাক্ষ নিক্ষেপ করে ঘরে চলে যায়। ফকিরচাঁদের চোখে কী যেন আছে। কেমন এক সম্মোহনের টান। সোনারবড়–র মতো তিন স্বামীর ঘর-করা জাঁহাবাজ পুরুষভোলানো মেয়েরও সে দৃষ্টিতে বুক কেমন করে ওঠে।
ছিটেবেড়ার এই মেটে ঘরের অনেকগুলো ঝাপ এই দ্বিপ্রাহরিক অবসরক্ষণেও বন্ধ থাকে। বন্ধ থাকে কুমিল্লা জেলার সোনারচর, কাশীপুর গুণপুরের হায়াতউদ্দীন, চান্দুর মা, কানিবিবির ঘর। বন্ধ থাকে রবের মা, কার্তিকার নানি ছাওনারার খালার দরজা। এদের লাগা কাজ। সাঁজ-ফিরতি কাজ এদের।
তবু দুপুরের কয়েকটি দ্রুত গড়িয়ে যাওয়া ক্ষণ এই বাড়িতে ধোওয়াধুয়ি, ঝাটপাট, ঝগড়া আর অশ্লীল ঠাট্টা-মশকরায় সরগরম হয়ে ওঠে।
তারপর রোদের তেজে একটু টান ধরতে ঝপাঝপ ঝাপ বন্ধ হয়। ক্ষিপ্র পায়ে যে যার বৈকালিক কাজে ফিরে যায়। যাবার সময় মায়েরা ছেলেপুলেদের কড়া তাগাদা দিয়ে যায় : ওই, দাউড়া টোহাইবার যালো।
কেউ বলে : খড়ি না আনলে সন্ধ্যায় ভাত হইব না।
এ বাড়ির পথে ঘুরে বেড়ানো খুদে জীবন-সংগ্রামীরাও তখন নিজ দায়িত্ব পালনে তৎপর হয়ে ওঠে। ছেঁড়া বস্তা, ওড়া, টুকরি নিয়ে কাঠ কুড়োতে বেরিয়ে পড়ে আমিরজান, বাতাসী, নূরী, গোলাবজান, গ্যাদা, ফেলাইনা, কালুর দল। গ্রামের বনবাদাড় নয়; এই শহরের আনাচে-কানাচে, অলিগলি মাঠে ফুটপাথে ওরা ভাত-রান্নার জ¦ালানি সংগ্রহ করে বেড়ায়। গাছতলায় পড়ে থাকা মরা ভাঙা ডাল, পাখির ঠোঁট থেকে ঝরেপড়া খড়কুটো, এখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়া টুকরো কাঠ, কাগজ, বাঁশের চটি কুড়িয়ে কুড়িয়ে ওরা ঝুলি ভরে। পড়ন্ত বেলার রোদে ওদের তৈলহীন পাটের ফেসোর মতো ঝটাধরা চুল আরও লাল দেখায়। গলার নিচে, হাতে পায়ে ময়লার আস্তরণ পড়া ধূলি-ধূসরিত রুক্ষ শরীরে ঘাম জমে আঠার মতো চটচট করে। কাঠির মতো সরু হাত-পা আর বেঢপ মাথা নিয়ে ওরা ছুটে ছুটে কাঠ কুড়োয়। কার সংগ্রহ বেশি হলো, তাই নিয়ে ওদের প্রতিযোগিতা চলে। অনেক সময় রেষারেষিতে হাতাহাতি, খামচাখামচি, চুলোচুলি থেকে রক্তপাত পর্যন্ত হয়ে যায় দলের ভিতর। শহরের মধ্যে এত ছুটো হাবিজাবি জ¦ালানিই বা আর কত পাওয়া যায়! তাই মাঝে মধ্যে অনেক সময় দুঃসাহসিক হাতসাফাইও করতে হয়। কাঁটাতারের বেড়ে টপকে কখনো ওরা কোনো ভদ্রবাড়ির সীমানায় ঢুকে পড়ে বাড়িঅলার দৃষ্টির অগোচরে। ফুলবাগান বা সবজিক্ষেতের বাঁশের মাচার কঞ্চির গোছা কিংবা জাফরি বেড়ার চটি ভেঙে টপাটপ ঝুলিতে ভরে পালায়। অথবা কারো বাড়ির সীমানায় পোঁতা একটা গোটা বাঁশ, না হয় জিওলের ডালই তুলে নিয়ে ছুট দেয়।
এর মাশুলও যে দিতে না হয়, তা নয। মাঝে মধ্যে ধরা পড়ে পেতে হয় অপরাধ অপেক্ষা গুরুতর শাস্তি। কোনো বাড়ির গেটে তাড়া খেয়ে খোয়াওঠা রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঠোঁট কেটে কারো দরদর করে রক্ত পড়ে। রুদ্ধশ^াসে ছুটে কঁঅটাতারের বেড়া পার হতে গিয়ে কারো হাতপা ছড়ে যায়।
ছুটে পালাতে পালাতে ওরা কুৎসিত গালাগাল ছোড়ে আর এক হাতের চেটোয় ঠোঁটের রক্ত মোছে। ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে থুতু দিতে দিতে হাতসাফাই করা কাঠের টুকরো বগলে চেপে ধরে। যন্ত্রণায় চোখের কোণো জমে ওঠা পানি চেপে ওরা বেপরোয়াভাবে হাসতে চেষ্টা করে। যেমন করেই হোক, জ¦ালানি ওদের যোগাড় করতেই হবে। তা না হলে সন্ধ্যেবেলা ঘরে ফিরলে মায়েদের হাতের নির্যাতন আছে। তার চেয়েও বড় ভয় তাকে, পেটের মধ্যে অবুঝ যে-অস্তিত্ব ক্ষুধার রূপ নিয়ে ওদের ছোট শরীরকে অবসন্ন করে তোলে। লাকড়ি না কুড়োলে চুলো জ¦লবে না। তার ভয়াবহ ফলস্বরূপ সারাদিনের ক্ষুধাকে এক খোরা পানি দিয়ে শান্ত করে শুয়ে পড়ে ছটফট করতে হবে। মনে হয় জীবনে ওরা ভয় করতে শিখেছে শুধু তাকে যার নাম ক্ষুধা। ক্ষুধার অবধারিত যন্ত্রণা ওরা জানে। আর এই ক্ষুধাই ওদেরকে নদীর ঢেউছোঁয়া শ্যামল ছোট ছায়ায় ঢাকা, পাখি ডাকা গ্রামের নীড় থেকে ছিনিয়ে এনে ফেলছে ইস্পাতকঠিন শহরের বুকে। ক্ষুধা ওদেরকে এই অপ্রস্ফুটিত বয়সেই করেছে বেপরোয়া, শিখিয়েছে পাপ, চিনিয়েছে জীবনর জটিল গোপন রহস্যের বাঁকাচোরা অলিগলি।
শরতের বৃষ্টিশেষ নীলাকাশের পরে পাতা-ঝরানো হেমন্তের হাওয়া যখন শহরের বুকে শীতের আগমনী জানিয়ে যায়, তখন এই কাঠকুড়োনো দলের মহাআনন্দ আর ব্যস্ততার দিন। ওরা তখন ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে পড়ে শহরের ছায়াঘন এলাকাগুলোতে। বেলী রোড, মিন্টো রোড, ফুলার রোড আর শহরের বৃক্ষরাজিঘন ফুটপাথগুলোতে উতলা শিরশিরে হাওয়ায় অনবরত পাতা ঝরে ঝরে পড়ে স্তূপ জমে ওঠে, ওরা ঝাঁটা হাতে কলরব করতে করতে সেগুলো ঝাঁট দিয়ে জমা করে বস্তায় ভরে মাথায় বয়ে বাড়ি আনে।
এছাড়া আছে বর্ষার জালানি সংগ্রহ। ঝুড়ি নিয়ে রাস্তায় ঘাটে মাঠে ঘুরে গোবর কুড়িয়ে এনে ঘুঁটে দেওয়া। ভাদ্রের রৌদ্রে মা বোনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওরাও ঘুঁটে দেয়। মায়েরা কাজে গেলে ছোটরা ঘুঁটে পাহারা দেয়। হঠাৎ বৃষ্টি এলে ঘরে তোলে। তারপর রৌদ্রে শুকিয়ে খটখটে হলে একটা একটা করে গুণে ঘরের একধারে স্তূপ করে সাজিয়ে রাখে। রাতে ছোটঘরের একধার জুড়ে থাকা শুকনো ঘুঁটের স্তূপের পাশে শুয়ে তার গন্ধে কেমন স্বস্তি আর নিরাপত্তা বোধ করে ওরা। যখন বর্ষার অনবরত বৃষ্টিতে পথঘাট ভাসবে, সারাটা গলি আর এই বাড়ির উঠোন এক হাঁটু কাদায় থকথক করবে, তখন আর লাকড়ির চিন্তা করতে হবে না। ঘুঁটে জালিয়ে ঘরের কোণে উঠোচুলোয় সন্ধ্যার পর মায়েরা ভাত রাঁধবে। ওরা ছেঁড়া কানি জড়িয়ে ভাতের রাইঙ ঘিরে বসে শরীর গরম করতে করতে মায়েদের কাছে গল্প শুনবে। সেই একই পুরোনো অথচ নিয়ত নতুন বর্ষাত গ্রাম, ভরে ওঠা নদী আর খালবিলের গল্প।
রাতে শুকনো ঘুঁটের পাশে শুয়ে সাত বছরের বাতাসী হয়তো মায়ের গলা জড়িয়ে বলবে : ‘মালো ঘহির গন্ধে দ্যাশের কথা মনে আছে। বাড়িত যাইতাম মনে কয়? দ্যাশে গোবর দিয়া দুয়ার লেপত না মা? দুয়ারে বইয়া চই ভ্যাইজা দিতি, ফেসতা পুড়াইয়া দিতি। মালো! বাড়িত যাইতি না আর? এহানো থাকতাম মনে কয় না। বাতাসীর মায়ের বোধহয় চোখের কোণ ভিজে ওঠে। ঘুঁটের গন্ধ নাকভরে টেনে নিয়ে অবুঝ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে তার সেই গোবর-নিকানো ছোট উঠোন আর নিকানো দোচালা ঘরটির কথা মনে করে। চালের ওপর লতিয়ে ওঠেছে ছালকুমড়োর ডগডগে লতা। ঘরৈর পিছনে বাঁশঝাড়ে হাওয়ায় কটকট শব্দ ওঠে। দক্ষিণের আলু ক্ষেত্রে জাকার দিয়ে শিয়াল ডেকে ওঠে। ঘরের কোণার নিমগাছে ভুতুম ডাকে।
কোথায় গেল সে দিন? সে ঘর? বাতাসীর বাপের অসুখে সর্বস্বান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত মহাজনের কাছে বাঁধা দিয়ে এসেছে তাদের সেই যতেœরÑ সাধের ঠাঁই।
এ বাড়িতে আরো একদল খুদে জীবনসংগ্রামী আছে। আছে গেদু রইসা ফেলু, সিরাজ, শামছেল, মরইনার দল। বয়স এদের দশ থেকে চৌদ্দর মধ্যে। এদেরকে প্রতিনিয়তই আপনি দেখেন, কিন্তু মনে রাখেন না। মনে রাখার বৈশিষ্ট্য কি আছে এদের মধ্যে? হয়তো আছে, হয়তো না নেই। এক ছাঁচে ফেলে ঢালাই করা বস্তুর মতো এরা আপনার কাছে একই চেহারা, একই শ্রেণি। বাসস্ট্যান্ডে, বাজারের মোড়ে অলিতে গলিতে হামেশাই আপনি এদের দেখছেন। সকলেরই বহিরাবরণ কমবেশি প্রায় একই রকম। সরু সরু খড়ি-ওড়া নোংরা হাত-পা, তৈলবিহীন লালচে চুল, বুকের উঁচু হয়ে থাকা পাজরের নিচে পিলে ভর্তি পেট। বয়স যা তার চেয়ে ছোট মনে হয় ক্ষীণ স্বাস্থ্যের জন্যে। কিন্তু এর সঙ্গে অত্যন্ত বেমানান মুখ। বয়সী অভিজ্ঞ অনেক নিষিদ্ধ জগতের ঘটনার ওয়াকিফহাল সেই মুখে কেমন একটা পাকা-পাকা চালাক ভাব। পোশাকও বিচিত্র। কারো পরনে পুরোনো রংচটা ধুলো-ওড়া ছেঁড়া লুঙি। এখানে ওখানে গিট বাঁধা। ঊর্ধ্বাঙ্গ নিরাবরণ। কারো পরনে অত্যন্ত বেমানান ঝলঝলে হাফপ্যান্ট হাঁটু ছাড়িয়ে নেমেছে। অনেকের পরনের শার্টটা প্রায় ব্লাউজের মতো শরীরে এঁটে বসেছে। কারো আবার কনুই ছাড়িয়ে নেমেছে শার্টের আস্তিন। এসব বিচিত্র ছেঁড়াফাড়া কাপড়ের মৌলিক অধিকারী যে এরা নয়, তা একনজেরেই উপলব্ধি করা যায়। এদের মায়েরা হয়তো কাজের বাড়ির থেকে চেয়েচিন্তে এনেছে।
এ পোশাক আপনার হাসি উদ্রেকের কারণ হতে পারে, কিন্তু এরা মহাখুশি শহুরে পোশাক পরেছে বলে। মায়েরা ভাবে, আহা! বাছাদের রোদ-জল-হাওয়া থেকে শরীর বাঁচাবার একটা সুরাহা হলো। হোক না ছেঁড়াফাড়া বেঢপ, তবু তো কাপড়! শরীরের আচ্ছাদন।
বাজারে গেলেই আপনি দেখবেন, তিন-চারজন একসঙ্গে ছুটে আসবে : কুলি লাগব সাব, কুলি?
আপনি মোট বইবার কুলি ভাড়া আদৌ করবেন কি না সে সিদ্ধান্ত করবার আগেই ওরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করবে : আমি আগে আইছি সাব। আমারে দেন।
: সাব, ও তো পরে আইছে! সবটির আগে আমি কইছি।
: ওই ফেলু, মুখখি খাবি। মিছা কথা কস! তুই আগে আইছস না আমি?
এছাড়া চৈত্র-বৈশাখের নিদাঘ রৌদ্রে আকাশ থেকে আগুনের হলকার মতো তাপ ছড়িয়ে পড়তে থাকে যখন, পথের কুকুর দোকানের ছায়ায় বসে হাঁপায়, কাকপক্ষী গাচের পাতার আড়ালে ছায়া খোঁজে, জনবিরল রাজপথে পীচ গলে যায়, পীচঢালা রাস্তাগুলো রৌদ্রে চকচক করে, দু’চারটে ট্রাক আর যাত্রীবিরল বাস পথ কাঁপিয়ে ছুটে যায়; তখন সেই প্রচ- রৌদ্রের হলকার নিচে ওরা ঘোরে। ধূলি উড়ে-যাওয়া গরম বাতাসে ওদের কিশোরকণ্ঠের চিৎকার অবিশ্রান্ত গলিতে গলিতে ভেসে বেড়ায়।
: এই যে মালাই আইসক্রিম, এক আনা দুই পয়সা। খাইলে দিল ঠান্ডা।
পায়ের নিচের উত্তপ্ত মাটির তাপে ওদের পায় ফোস্কা পড়ার উপক্রম হয়। কাঠি কাঠি স্বাস্থ্যহীন হাত দিয়ে আইসক্রিমের বাক্সটা মাথার ওপর ধরে রাখতে রাখতে হাত অবশ হয়ে আসে। কপাল বেয়ে নেমে আসা নোনতা ঘাম ঠোঁটের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়। পিপাসায়, ধুলায় ওদের জিভ শুকিয়ে কণ্ঠ জড়িয়ে আসে। শুষ্ক তালু জিভ দিয়ে ভিজিয়ে ওরা রাস্তায় চিৎকার করে ডেকে যায় : কলিজা ঠান্ডা মালাই আইসক্রিম, মাত্র এক আনা। মাত্র দুই পয়সা। আইসক্রিম মালাই।
এছাড়া বাসস্টপেজে বা রাস্তার জনবহুল ফুটপাথে আপনি ওদের দেখেননি?
বাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে ঘামতে ঘামতে স্টপেজে এসে না দাঁড়াতেই আপনার সামনে দিয়ে যাত্রীবোঝাই বাসটা ছেড়ে গেল। দুমিনিটের জন্য হয়তো বাসটা ‘মিস’ করে তখন আপনার মেজাজ তপ্ত কড়াইতে বেগুন ছাড়ার পূর্ববর্তী অবস্থায় আছে। মনে মনে আপনি বোধহয় আজকের লেট হওয়ার নতুন কী কৈফিয়ত বড় সাহেবকে শোনাবেন তার মহড়া দিচ্ছেন : এমন সময় শুনলেন : পালিশ লাগব সাব পালিশ?
আপনার মনের তপ্ত কড়াইয়ে যেন বেগুন পড়ল। খিঁচিয়ে উঠলেন আপনি। জুতো পালিশের বাক্স কাঁধে ঝুলানো দশ বছরের নোংরা ছেলেটার ওপরই আপাতত বাস না-পাওয়ার ঝাল ঝাড়লেন।
: যা ব্যাটা, পালিশ করাতে এসেছে! এদিকে অফিস আধঘণ্টা লেট হতে চলল... মনের ফুর্তিতে বাঁচছি না, এখন জুতো চকচকে করব। খবরদার ব্যাটারা বাস স্টপেজে এসে জালাবি না।
ছেলেটা কিন্তু দমে না। আপনার পায়ের কাছে বসে পড়ে জুতোজোড়া নির্দেশ করে বলল দ্যাহেন সাব, কেমুন ময়লা জুতা। এই জুতা পায়ে আপনেরা সাহেবসুবা অফিস যাইবেন ক্যামনে? কন তো এমুন পালিশ কইরা দিমু একেবারে জুতা দেইখা মাথা আঁচড়াইবার পারবেন। জুতা মনে হইব না, মনে হইব আয়না।
ছেলেটার কথার বাচালতায় অথবা আপনাকে সাহেবসুবার পর্যায়ে উন্নীত করায় আপনার মেজাজ কিছুটা নরম হতে পারে। এটাও বোধহয় খেয়াল হলো জুতোজোড়ার সত্যিই মলিন অবস্থা। দরাজ গলায় বললেন : দে ব্যাটা, পাঁচমিনিটে সারবি। কত নিবি?
ছেলেটা আর্কু দন্ত বিস্তারিত হাসি দেখিয়ে পালিশের সরঞ্জাম খুলে বলবে : একবার দেইখা লন। কাম বুইঝা দাম।
কয়েক মিনিটে আপনার জুতো যখন সত্যি চকচকে হয়ে উঠেছে, তখন দ্বিতীয় বাসটা প্রায় এসে গেছে। আপনি পা টেনে পকেটে হাত দিয়ে রেজকি খুঁজলেন। তারপর একটা দশ পয়সা ফেলে দিয়ে চলতি বাসটায় কসরতের সঙ্গ লাফিয়ে উঠলেন। ছেলেটা ঘ্যান ঘ্যান করতে করতে আপনার পিছু পিছু ছুটে বাসে উঠেছে।
: আরো দুই আনা সাব।
: আবার কী! ভাগ ভাগ, মগের মুল্লুক পেয়েছে আর কি!
আপনি ধমকালেন। ছেলেটা বেপরোয়া ভঙ্গিতে ঘাড় বাঁকা করল : ভাগুম ক্যান? হক্কের পয়সা ফালাইয়া যান সাব। মগের মুল্লুক তো আপনেগো।
বাসের কন্ডাক্টর এসে ঘাড় ধরে ছোঁড়াকে বাস থেকে নামিয়ে দিল। চলতি বাসটার সঙ্গেই ছেলেটা ছুটতে থাকে : দ্যান সাব, আর দুই আনা। দেন... সাব... ও... সাব...।
শেষ পর্যন্ত চলতি বাসটাকে লক্ষ্য করে অশ্লীল গাল ছোড়ে। গালটা আপনিও শুনলেন। বাসের আর দশজনকে ডেকে এদের ক্রমবর্ধমান আস্পর্ধা সম্পর্কে আলোচনা করলেন। কিন্তু আপনার হয়তো একবারও মনে হলো না, ওরই বয়সি আপনার দশ বছরের ছেলেটা এখন গরম ভাত খেয়ে বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছে।
লোকাল ট্রেনগুলোর সঙ্গেও এই বুটপালিশ ছেলেরা ঘোরে। চরতি ট্রেনে এক কামরা থেকে বাদুড়ঝোলা হয়ে হ্যান্ডেল ধরে বিশেষ কসরতের সঙ্গে ওরা আর এক কামরায় উঠে পড়ে। : পালিশ লাগব সাব, পালিশ।
রোজগার ওদের ধরা-বাঁধা কিছু নয়। কোনোদিন কোনো দিলদরিয়া সাহেব আশাতীত বখশিশ দিয়ে ফেলেন। আবার কখনো ন্যায্যদাম দাবি করে কপালে জোটে চড়চাপড়, গলাধাক্কা। তবে শহরে এসে ওরাও চালাক হয়েছে। রোজগারের সবটুকু মা-বাপকে বা মহাজনকে না দিয়ে কিছু লুকিয়ে রাখে। ইচ্ছেমতো এটা-ওটা কিনে খায়। নয়তো দল বেঁধে সিগারেট কিনে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সিনেমা হলের সামনে যায়।
চৌদ্দ বছরের গ্যাদা হয়তো বলে : ল, গুলিস্তানে যাই। ওইহানে ভালো খেল হইতাছে।
এগারো বছরের মরইনা বলে : দূর ওইহানে তো ইংরাজি খেইল। ভালা লাগে না। গ্যাদা চোখের ইঙ্গিতে বাধা দেয় : আর, ল, ল, সাহেব-মেমগো কায়কারবার তো দ্যাখন যাইব।
গ্যাদার ইঙ্গিতে দলের সবাই হেসে ওঠে।
ইংরেজি সিনেমায় কী কা-কারখানা দেখায়, তা ভাষা না বুঝলেও ওরা উপলব্ধি করে।
সাগরপারের রঙিন ছবি আর হুর-পরীর মতো সাহেব-মেমদের কার্যকলাপ দেখে ভরাট হৃদয় নিয়ে ওরা বাড়ি ফেরে। যে যৌবন আরো সাত-আট বছর পরে আসবার কথা, এই মহানগরীর বাঁকাপথ সে জীবনকে অকালে বিকৃতভাবে এনে দেয় এদেরকে।
ওরা তাই পথচলিত কোনো মেয়ে দেখলে শিস দিয়ে ওঠে। গানের কলি গেয়ে সিটি বাজায়। কিন্তু কেন, তা ওরা নিজেরাই বোঝে না।
তবুও কাজ বন্ধ করা বৃষ্টিতে যখন শহর থৈ থৈ করে, কিংবা সওদা বিক্রির মন্দার জন্য মহাজনের কাছে গালমন্দ জোটে অথবা খরিদ্দারে কাছে নির্দয় ব্যবহার পায় আর তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ বাড়িতে খেতে বসে মাটির খোরায় ভাতের বরাদ্দ কমে যায়, সেদিন ওদের মন উদাস হয়। শহরের কোনো আকর্ষণই আর মনোমুগ্ধকর মনে হয় না। উৎকট উদগ্র যৌবনা লাস্যময়ী সিনেমাতারকার বিজ্ঞাপনের রংচঙে পোস্টার, চিড়িয়খানার তাজ্জব জীব-জানোয়ার, রমনার মাঠের ঘোড়দৌড়ের উত্তেজনা সবই অর্থহীন মনে হয়।
ওদের মনের আয়নায় তখন এক বিগত সুখের ছবি ভেসে ওঠে। সেই ছোট ছোট গ্রামকে ঘিরে নীলম্বরী শাড়ির মতো আঁকাবাঁকা নদী। বিস্তীর্ণ ক্ষেতের পরে খাল পার হয় দেখা যায় বিলের কালো জলের রেখা। একটু বাতাসে বিল আর হাওরের কালো কালো বোবা ঢেউ সাপের মতো ফণা তুলে নাচে। বইন্যা গাছের আড়াল দিয়ে যখন-তখন চোখে পড়ে নানা রঙের পাল উড়িয়ে চলেছে ধান, পাট,খড়, মাটির হাঁড়ি-কলসি আর বিভিন্ন গাওয়ালের নাও। বাাজরখোলার ঘাটে এসে শুভ্র রাজহংসরি মতো দিনে দুই-একবার লঞ্চ ভেড়ে। বিভিন্ন কোলাহলে সেই সময়টা বাজারখোলার বাতাস ভরে ওঠে। সে আর এক জীবন। তাতে ছিল অন্য উন্মাদনা। গাঙের পাড়ে মাঠে গরু চরাতে চরাতে আকাশে ঢাউস ঘুড়ি ছেড়ে দিয়ে বটতলায় ওরা ডাংগুলি খেলেছে। কোনো দিন বিকেলে পানি নেমে যাওয়া গাঙপাড়ের কালো নরম কাদা খুঁড়ে টাকি আর চিংড়ি ধরে বাড়ি ফিরেছে। নয়তো খালের পানিতে ওচা পেতে রুপোর মতো চকচকে একঝাঁক পুঁটি আর বেলে মাছে ছোট মাটির কলসি ভরে গান গাইতে গাইতে পড়ন্ত রোদে বাড়ি ফিরেছে। নাড়া দিয়ে ভাত রাঁধতে রাঁধতেই খুশিমুখে ক্ষিপ্রহাতে মায়েরা মাছ কুটে নিয়েছে। রাত্রিবেলা কুপির আলোয় লাল চালের ভাতের সঙ্গে কাঁচামরিচ দিয়ে রান্না পুঁটির তরকারি মেখে ভাত খেতে খেতে মায়ের মুখটাকে অপূর্ব মমতাময়ী মনে হয়েছে।
শহরের ঘিঞ্জি বস্তিতে অভাবক্লিষ্ট সংসারে সেই ¯েœহময় বাবা, মমতাময়ী মা হারিয়ে গেছে। এখানে সকলে যেন শুধু একটা সমস্যাই জানেÑ সেটা টাকাপয়সা রোজগারের সমস্যা পেট ভরে একবেলা খাবার সমস্যার সমাধানে মা হয়েছে খিটখিটে কুটিল, বাবা নির্মম স্বার্থপর।
ওদের চোখ ঠেলে পানি আসে। কে জানে, সেই গ্রামে সেই নীল নদীর ¯িœগ্ধতায় কবে ওরা আবার ফিরে যাবে। ফিরে পাবে সেই গৃহের আশ^াস, মা আর বাবার স্বার্থহীনহ। শহর নয়, আজও নদী এদের ডাকে।
নদীর বুকে সেই উন্মুক্ত আকাশের নিচে আর শ্যামল প্রান্তরের শেষে ছায়াঘন কুটিরের ওপর নেমে আসা গোধূলি অন্তেরগ্ধ সন্ধ্যা। এখানে এই নগরীর সন্ধ্যা জলসা ঘরের নটীর উচ্ছলতায় আর হাজার রঙের উজ্জ্বলতায় যেন মাদকতা আর মোহের জাল ফেলে সন্তর্পণে নেমে আসে। এখানে সন্ধ্যা ঘরে ফেরার ডাক নিয়ে কল্যাণী নারীর মতো দিনের অন্তে এসে দাঁড়ায় না।
নগরীর সন্ধ্যা চটুলা বেশে আলোকসম্ভারে উদ্দীপ্তা হয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকে ঘরের মানুষকে। সিনেমাহলের সামনে, অভিজাত দোকানের ঝকঝকে শোকেসে, উন্মুক্ত বাজনা বাজা রেস্তোরাঁর রঙ-বেরঙের আলো দিনের প্রখরতাকে ভুলিয়ে দেয়। কিছু আলো আর কিছু আঁধারের কারুকার্যে এ নগরীর সন্ধ্যা মোহময়ী। একদিকে জীবন বাসনা-কামনার তৃপ্তিতে উদ্দাম, আর একদিকে ছায়ার আড়ালে গুটিগুটি পা ফেলে হেঁটে চলে পাপ। নির্লজ্জ হাতে বিকিকিনি, লেনদেন, ঈর্ষা আর পাশবিকতার হিসাব বুঝে নেয়।
অভিজাত বিপণি কেন্দ্রের ফুটপাথে পার্ক করে রাখা ঝকঝকে সারি সারি গাড়িতে নিয়ন আলোর ছটা রঙিন ঝরনার মতো ঝিকিয়ে ওঠে। সুবেশা সুরূপা নারী আর সুখী চেহারার পুরুষেরা জোড়া বেঁধে দোকানে দোকানে ঘোরে। শীতল পানীয়র শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রিঙ্ক হাউসের দরজায় ভিড় করে। লাল নীল আলো শোভিত ‘বারের’ অভ্যন্তরে টুংটাং কাচের পাত্রের শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে অহেতুক কাচভাঙা শব্দের মতো হাসির ঝড় তোলে। কত সুখী-সুন্দর, আর পরিতৃপ্ত কত স্বচ্ছন্দ গতির জীবন। এরাই তো নগরীর সন্ধ্যাকে করে মোহবিল! এদের জন্যেই তো সন্ধ্যার যত আয়োজন! লুটে নাও, চেটেপুটে নিঃশেষে পান করে নাও ভঙ্গুর এই জীবনের আনন্দ। এক হাতে ছড়িয়ে দাও অনুপার্জিত মোটা আয়ের সঞ্চয়ের স্তূপ। চিন্তা কি! নদীর স্রতের মতো টাকা এসে জমছে ব্যাংকের...