শুক্রবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / ফ্যাশন / ‘সেক্সি’ বার্বি ডলের হিজাব ধারণ!
০৩/১৬/২০১৬

‘সেক্সি’ বার্বি ডলের হিজাব ধারণ!

- বাধন অধিকারী

পশ্চিমের ‘সেক্সি’ বার্বি ডল হিজাব ধারণ করেছে! যা বলছি, তার মধ্যে খানিকটা রসবোধের মিশেল থাকলেও কথাটা মিথ্যে নয়। ৭ ফেব্রুয়ারি টাইমস অব ইন্ডিয়া খবর দিয়েছে, নাইজেরিয়ার ২৪ বছর বয়সি শিক্ষার্থী হানিফা আলম বার্বি স্টাইলের পুতুলকে হিজাব পরিয়ে তা বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হানিফার এই সিদ্ধান্তকে নিছক খেয়াল কিংবা কেবল ব্যবসা ধান্দা আকারে দেখছি না আমি। নাইজেরীয় ওই মুসলিম তরুণীর নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইসলামী-পুঁজিবাদের বিকাশ, সন্ত্রাসবাদীগোষ্ঠী আইএসের ব্যাপক উত্থান, পশ্চিমা মূলধারার মুসলিম-ভীতি আর এরই বিপরীতে জন্ম নেওয়া পশ্চিমা মুসলমান সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক সঙ্কটকে মিলিয়ে পড়ার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয়েছে। সেখান থেকেই এই নিবন্ধের অবতারণা।

হাঙ্গেরিতে উচ্চশিক্ষারত বাংলাদেশের একজন নৃবিজ্ঞানী নাসরিন খন্দকার ‘পুতুল খেলার রাজনীতি’ নামের এক পুস্তিকায় পশ্চিমা বার্বি ডলের সঙ্গে নারীর যৌনকরণ (সেক্সুয়ালাইজেশন), বর্ণবাদ, আর বাজারের সম্পর্কসূত্রটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। নাসরিনের পুস্তিকায় তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৫৯ সালে আবির্ভাবের পর থেকে বারবার বদলানো হয়েছে বার্বি পুতুলের স্টাইল। আর উইকিপিডিয়া বলছে, এখন ৭ ধরনের গায়ের রং, ২২ রংয়ের চোখ এবং বিভিন্ন হেয়ারস্টাইলবিশিষ্ট বার্বি ডল বাজারে পাওয়া যায়। তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই কথিত বৈচিত্র্য সত্ত্বেও বার্বি শুরুর দিন থেকে আজকে পর্যন্ত তার একটা জায়গা পরিবর্তন করেনি। জন্মলগ্ন থেকে বার্বি পুতুল তার ‘সেক্সি’ ইমেজ ধরে রেখেছে। বৈচিত্র্য সত্ত্বেও বার্বির সাধারণ বৈশিষ্ট্য অটুট থাকে; অটুট খাকে তার যৌন আবেদনময়ী অবয়ব।

বার্বি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাটেলের অন্যতম রুথ হ্যাল্ডলার ইউরোপ বেড়াতে গিয়ে জার্মানিতে লিলি নামের এক পুতুল দেখেন, যা প্রাথমিকভাবে পুরুষের যৌনোপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই পুতুলের প্রেরণাতেই রুথ হ্যাল্ডলার বার্বির নকশা করান। তাকে বানান মোহনীয়, শরীরসর্বস্ব, আর প্রদর্শনযোগ্যতার মাপকাঠিতে আদর্শ আকারে। কিন্তু হায়! সেই বার্বি স্টাইলের পুতুলকেই কিনা এবার হিজাব পরিয়ে দিতে যাচ্ছেন একজন নাইরেজীয় মুসলমান! তাও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্যই!

হুম পাঠক, নিজে যে পোশাক পরেন ঠিক তেমন করেই একদিন বার্বিকে সাজান ২৪ বছর বয়সি শিক্ষার্থী হানিফা আদম। বার্বির গোটা শরীর কাপড়ে ঢেকে দেন তিনি। আর বার্বির মাথায় পরিয়ে দেন হিজাব। আর এর নাম দেন হিজাবি। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাওয়া যাবে ২৪ বছর বয়সি হানিফা আদমের তৈরি হিজাবি। আর মার্চের মাঝামাঝি যুক্তরাজ্যের বড় বড় খেলনা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যাবে এটি। প্রতিটি হিজাবির দাম পড়বে ৯.৯৯ পাউন্ড করে। হানিফার ইচ্ছে, আস্তে আস্তে তিনি তার ব্যবসা বিস্তৃত করবেন।

যাহোক, আমাদের বাস্তবতাই হলো, একদল ইসলামী-চরমপন্থী নাম ধারণ করে নারীকে হিজাব পরতে বাধ্য করতে চায়, আর পাশ্চাত্যের একদল কথিত আধুনিক প্রগতির ধ্বজা ধরে নারীর হিজাব পরা নিষিদ্ধ করতে চায়। নারীর নিজস্ব অবস্থান কারও কাছেই জরুরি মনে হয় না। তবে যে পশ্চিমে বাস্তবেই নারীর হিজাব নিয়ে জটিলতা, সেই পশ্চিমে হানিফা হিজাব পরিহিত পুতুল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলেন, একেবারে ‘সেক্সি’ বার্বিকে হিজাব পরিয়ে দিলেন; এটার মধ্য দিয়ে তিনি কিন্তু পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের (কালচারাল হেজিমনি) বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ রচনা করলেন। এটা খুবই ঠিক যে, তিনি ব্যবসা ধান্দাতেই এটা করেছেন। তবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, এর মধ্য দিয়ে ‘সেক্সি শরীরসর্বস্ব নারী’র পশ্চিমা আদর্শকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। হিজাবকে সামনে আনতে চেয়েছেন আদর্শ নারীর প্রতীক আকারে। আমার মত, এই জায়গাটা গুরুত্ব দিয়ে বোঝার দরকার আছে।

আসলে মুক্তবাজারের এই নব্য উদারবাদী যুগপর্বে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ইসলামিক পুঁজিবাদ’ (ইসলামিক ক্যাপিটালিজম); যা ‘সেক্সি’ বার্বিকে হিজাব পরিয়ে ছাড়ছে! অন্য অনেক ব্যবসার পাশাপাশি বই-ক্যাসেট-সিডি-টেলিভিশন-রেডিও-হিজাব-বোরকা-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো বিস্তৃত পরিসরের সাংস্কৃতিক বাজার আজ ইসলামিস্টদের হাতে।

‘ইসলামি পুঁজিবাদের উত্থান’ (রাইজ অব ইসলামিক ক্যাপিটালিজম) নামের এক বইতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এবং ইসলামিক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভেলি নাসের দেখিয়েছেন, আদতে একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে তুলে আনার মধ্য দিয়ে ‘ইসলামি চরমপন্থা’ রুখে দেওয়ার স্বপ্ন পশ্চিম দেখেছিলো। পশ্চিমা বুর্জোয়ারা যেভাবে ইউরোপের পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলো, মুসলমানদের এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি সেই একই কায়দায় মুসলমানদের মনোভঙ্গি, রাজনীতি এমনকী ধর্মীয় ধ্যানধারণাতেও বদল ঘটিয়ে দিয়েছে। সর্বাত্মক কর্তৃত্ববাদী ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে ব্যর্থ অর্থনীতির কারণে চরমপন্থা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরব আমিরাত, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, ইরানের মতো দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সাফল্য আনতে সমর্থ হয়েছে। ভেলি নাসের তাই বলছেন, মুসলিম বিশ্বের আজকের লড়াই আর ধর্মের জন্য নয়, তাদের মহালড়াই এখন পুঁজিবাদী বাজারের জন্য। এদিকে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার মোনা আতিয়া সামনে এনেছেন ‘ধর্মীয় নব্য উদারবাদ’ নামের ধারণা। তিনি দেখিয়েছেন, পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলোর মতো করে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো দল কী করে বেসরকারি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে মানুষদের, হয়ে উঠছে পাশ্চাত্য দাতা সংস্থাগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী।

তবে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যের নারী বিষয়ক এক জার্নালে প্রকাশিত ‘মুসলিম নারী, ভোক্তা পুঁজিবাদ এবং ইসলামী সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি’ (Muslim Women, Consumer Capitalism, and the Islamic Culture Industry.) নামের প্রবন্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এই ইসলামী পুঁজিবাদ পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করলেও নিজেদের (মুসলমান) সমাজে জারি থাকা প্রান্তিকীকরণ আর অসমতাকে কমাতে পারেনি। সেখানে বঞ্চনা আছে। আছে হতাশা আর ক্ষোভ। তাই বিদ্রোহও আছে। সঙ্গত কারণেই আছে জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসবাদ। আর সেগুলোকে ঘিরে মুক্তবাজারের বেচাকেনাও রয়েছে। সন্ত্রাসবাদীদের কাছে বিক্রি হয় সামরিক সরঞ্জাম। সন্ত্রাসবাদের ভীতি বিক্রি হয় মিডিয়ায়। ইন্টারনেটে সন্ত্রাসবাদ এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। পাশ্চাত্যের নারী-পুরুষও ঝুঁকছে সেই সন্ত্রাসবাদে।
কিছুদিন আগে খোদ পাশ্চাত্যের সংবাদমাধ্যমগুলোই খবর দিয়েছে, সেখানকার নারীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন ‘হট জিহাদি’ তথা ‘জিহাদি’দের প্রতি। এই প্রেক্ষাপটে হানিফার হিজাবি বার্বির বাজারটা মন্দ হবে না বলেই মনে হচ্ছে!