সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / আমার মা - শামীম আজাদ
০৪/১৮/২০১৭

আমার মা - শামীম আজাদ

-

কবি, গল্পকথক ও লেখক- একের মধ্যে অনেক সত্তার সমন্বয়। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সুদূর বিলেতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে তাঁর প্রতিভার দ্যুতি। কবি শামীম আজাদ বর্তমানে বিলেতে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। ২৭ বছর দেশের বাইরে থেকেও বুকের পাঁজরলগ্ন করে রেখেছেন আরেকটি বাংলাদেশ। কবিতা, নাটক, শিশুগ্রন্থ, অনুবাদ, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও ছোটগল্প মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা এ-পর্যন্ত ত্রিশের অধিক।

বহুমাত্রিক এ-কবির জন্ম ১৯৫২ সালের ১১ নভেম্বর। আদি বাড়ি মৌলভিবাজার, সিলেট। বাবা আবু আহমদ মাহমুদ তরফদার ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি। মা খাদ্যবিলাস গ্রন্থের লেখক আনোয়ারা খানম। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার প্রয়াত স্বামী আবুল কালাম আজাদ ছিলেন চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট্যান্ট। তার বিদেশে বেড়ে ওঠা তার কন্যা ঈশিতা আজাদ ও পুত্র সজীব আজাদ যথাক্রমে এখন বাংলাদেশের ‘বেঙ্গল গ্রুপ ও বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক’-এর বিআইবিএমএতে চাকরি করছেন। তার একমাত্র নাতনির নাম আনাহিতা।

১৯৬৭ সালে জামালপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৬৯ সালে টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্মান (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) এবং ১৯৭৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯২ সালে লন্ডন থেকে কিউটিএস (কোয়ালিফাইড টিচার্স স্ট্যাটাস), ২০০২ সালে লন্ডন আর্টস বোর্ডের বৃত্তিতে এ্যাপল্স অ্যান্ড স্নেইক্স থেকে পোয়েট্স ইন এডুকেশনে স্নাতক এবং ২০০৭ সালে ওপেন কলেজ নেটওয়ার্ক থেকে গল্পকথনে হেরিটেজ এ্যানিমেটর হিসেবে স্নাতক অর্জন করেন।

কবি শামীম আজাদ একই সঙ্গে কাজ করছেন যুক্তরাজ্যের সামার ইউনিভার্সিটি টাওয়ার হ্যামলেটস, সান্ডারল্যান্ড সিটি লাইব্রেরি ও আর্ট সেন্টার, ইস্ট সাইড আর্টস, ম্যাজিক মি, রিচমিক্স, ব্রমলি বাই বো সেন্টার, হাফ মুন থিয়েটার এবং বাংলাদেশের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তিনি লন্ডনের এক্সাইল রাইটার্স ইঙ্ক-এর কার্যকরী কমিটি সদস্য, রিচমিক্স কালচারাল সেন্টারের ট্রাস্টি, এ্যাপল্স অ্যান্ড স্নেইক্স, বার্ডস উইদাউট বর্ডার ও পোয়েট্রি সোসাইটির আবাসিক লেখক ও কবি।

২০০২ সালে তাঁর উদ্যোগে বিলেতে বাংলাদেশের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শাখা প্রতিষ্ঠিত হবার পর বাঙালি নারীদের জন্য মোবাইল লাইব্রেরি, নিয়মিত স্টাডি
গ্রুপ, শিশুদের বাংলা বলার ক্লাস, রাইটিং ওয়ার্কশপ ছাড়াও বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে হচ্ছে বাৎসরিক বৈশাখি লিটারেচার উৎসব- বইলিট। তিনি বিলেতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বাংলা পাঠ্যসূচি উপদেষ্টা ও প্রশ্নপত্র যাচাইকারী এবং স্কুল পর্যায়ের বাংলার শিক্ষক প্রশিক্ষক।

শামীম আজাদ বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। লেখা, কবিতা ও গল্পকথন তার পেশা। তাঁর কণ্ঠে একই সঙ্গে ধ্বনিত হয় বাংলাদেশ এবং ইউরোপিয়ান রূপকথা। পৃথিবীবিখ্যাত এডনিবরা ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যালে প্রথম বাংলাদেশি কবি হিসাবে পরিবেশন করেছেন স্বরচিত কবিতা ও গল্প। তিনি প্রাচ্যের বাচিক শিল্পের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পাশ্চাত্যের শিক্ষা এবং বিনোদনের সুতোয় গেঁথে নিত্য পৌঁছে দিচ্ছেন সর্বত্র।

প্রবাসী বাঙালিদের দেশের মাটিলগ্ন রাখতে গ্রহণ করেন এক অবিস্মরণীয় উদ্যোগ-বিজয়ফুল। এ বিজয়ফুল তার লালিত স্বপ্ন হলেও এখন বহির্বিশ্বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অমর করে রাখার জন্য হয়ে উঠেছে এক অনন্যোপায়।

তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: হে যুবক তোমার ভবিষ্যত, মধ্যবিত্ত বদলে যাচ্ছে, দুই রমণীর মধ্য সময়, ওম, রানীর দেশে রঙিন বেশে, পকেট ভরা পাপড়ি, ১০০ প্রেম অপ্রেমের কবিতা, বুরগী দ্যা বার্গেন্ডী চিতা, এ্যা ভক্সাল কোরাস ও ব্রিটিশ বাংলাদেশী পোয়েট্রি।

পুরস্কারে: বাংলাদেশ থেকে বিচিত্রা অ্যাওয়ার্ড ফর ফ্যাশন জার্নালজিম ১৯৯২। ১৯৯৫ ও ফ্যাশন পাঠশালা থেকে আজীবন সম্মাননা ২০১৩ পেয়েছেন। বিলেতে পেয়েছেন বাংলাদেশি হুজ হু অ্যাওয়ার্ড ২০০৯, চ্যানেল এস কমিউনিটি সম্মাননা ২০০৯, টাওয়ার হ্যামলেটস বারা সিভিক অ্যাওয়ার্ড ২০০৪, আব্দুর রব চৌধুরী পুরস্কার ২০০৪ ও ইয়ার অব দ্য আর্টিস্ট আর্ট কাউন্সিল। ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন শামীম আজাদ।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের ব্যক্তিত্ব আপনার জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন?
উত্তর: আমার শিল্পস্পৃহায়, সেবান্মুখ কাজকর্মে ও জীবনে যে-কোনো পরিস্থিতিতে প্রত্যাশাকে মানিয়ে নিয়ে সুখী থাকার ক্ষমতার ব্যাপারে প্রায় পুরোটাই। জন্মসূত্রে দৈবের বশে বাবা ও মা হিসেবে একজোড়া সুন্দর মানুষ পেয়েছিলাম। পুনরায় পাবার ও পছন্দের সুযোগ থাকলে ওদেরই চাইতাম।

আব্বার চাকরিসূত্রে তেরো বছর বয়সে রৌদ্র জ্বলজ্বলে ছোট্ট শহর জামালপুর ছিলাম। শুকনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের সেই শহরের প্রধান সড়কটি আমাদের বাংলো প্যাটার্নের বাড়ির সামনে বেঁকে চলে যেত রেল স্টেশন পর্যন্ত। রাস্তার সেই বাঁকেই আমাদের বাড়ি। সেখানেই বিশাল এক বিলবোর্ডজুড়ে তিব্বত স্নোর বিজ্ঞাপনের নারী আঁকছিলেন এক রিকশাআর্ট শিল্পী। তিনি খিদে পেলে মই থেকে নেমে ঘাসে বসে কামড়ে কামড়ে খেতেন বনরুটি আর সাগর কলা। মা ড্রইং রুমের পর্দার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখতেন। দু’দিন আমাকে ও ভাইয়াকে দিয়ে তাকে ডেকে বাসায় চা ও নাস্তা খাইয়ে ছিলেন। তারপর একদিন কিছু টাকা দিয়ে ঐসব রঙের ছোট্ট ডিবে কিনে আনতে অনুরোধ করলেন। পিওন মনাভাই স্টেশনের বাজার থেকে সাইকেলের পেছনে টুকরিতে করে কিনে আনালেন ছোট মাটির হাঁড়ি আর সরা। আব্বা অফিস থেকে নিয়ে এলেন ব্যবহৃত কার্বন পেপার। সেসব জিনিস ব্যবহার করে কদিনেই তার এতদিনের সূচিকর্মের উত্তরণ ঘটিয়ে মনোহর করে তুললেন মাটির হাঁড়ি পাতিল।

আম্মা’কে ঈশিতা ও সজীব ফ্যামিলি নার্স বলে ডাকতো। ভাইবোনদের পরিবারসহ কারো অসুখ হলে যত ঝামেলাই থাকুক, কোথা থেকে তিনি নিরাময়ী দেবীরূপে আবির্ভূত হতেন। অসুখের প্রকৃতি অনুযায়ী তার সঙ্গে রিকশা থেকে নামতো ডাবের জল, মেথি ফোড়ন দেয়া জাউ, জলপট্টির বিশেষ ত্যানা, দু’ফালি কাগজিলেবু ইত্যাদি। তারপর ভালোবাসার জনকে নরম হাতে স্পর্শ দিয়ে সেবা দিয়ে গল্প বলে ভুলিয়ে ভালিয়ে সুস্থ করে সোবহাননবাগ কলোনিতে ফিরে যেতেন।

আম্মা যেন ছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াতের সেই সুগৃহিণী। যে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও প্রাসঙ্গিক সব নীতিকে হাতে ধরে এনে সংসার করে গেছেন। কুচি দেয়া জামা পুরানো হলে উপরটা ঘর মোছার কাপড় বানিয়ে শক্ত ঝুল দিয়ে বানিয়েছেন কামিজ। তাতে এমনভাবে ফুলপাখি সেলাই করেছেন যে বন্ধুরা মনে করেছে ওটাই এক নতুন জামা আর কি! মাংস সংরক্ষণ করেছেন রোদে শুকিয়ে। ঘি ভাত খাচ্ছি বলে বিকেলে স্কিপিং করিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে আমরা যখন তিন বেলাই ভাত খেতাম, তখন সরকারের রুটি খাওয়ার চাপ এলে বাসায় তা শুরু হলো। অন্যরা হয় ভুরু কোঁচকায়, নয় মূর্ছা যায়। এসব দেখে ফুড কনট্রোলার বাবার সুযোগ্য সঙ্গিনী আমার মা গম দিয়ে রুটি পরোটা পিঠা হালুয়া ও আগুনের চুলায় বিস্কিট বানিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের ডেকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এদিকে শেষ বয়সে আমার কাছে বিলেত এসে থাকার কালে নোট বইয়ে বাংলায় কিছু সাধারণ ইংরেজি সংলাপ লিখে মুখস্থ করে কাজ চালিয়ে গেছেন। সে বিদ্যাতেই একা একাই চারদেশে থাকা চার ভাইবোনদের কাছে হুইল চেয়ারে করে উড়ে বেড়িয়েছেন।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে যে অবস্থানে রয়েছেন, সেক্ষেত্রে আপনার মায়ের অনুপ্রেরণা ও অবদান কতখানি? আপনার অর্জিত সাফল্যের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা কেমন?
উত্তর: আমার কি আর অবস্থান হাসান! কোথায় কি দেখলে বল? মা থাকলে শুনে মিষ্টি মিষ্টি হাসতেন, তারপর আপনার জন্য তার হাতে তৈরি চালের গুঁড়োর নুন গড়া আর ভুনা মাংস খাওয়াতেন। বহু আগে একবার এক ফটোগ্রাফার আমার সঙ্গে তাঁরও ছবি তুলতে চাইলে কি সুন্দর মুখে পনড্স ক্রিম মেখে এসে আমার কভার স্টোরি করার জন্য পাশে বসেছিলেন। বুঝি নিরুচ্চারে তাই হচ্ছে তার আমার কাজকে স্বীকৃতি দেয়া। তার ভাগ নেয়া। যখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সাংবাদিকতা করছি আর দেশি ফ্যাশনের জন্য খ্যাপার মতো কাজ করে যাচ্ছি, তখন মডেলদের সাজাতে তার নিজের হাতে বানানো পুঁতির মালা, দুল, মল সব নিয়ে চলে আসতেন। মেয়েদেরকে নিজেই পরিয়ে দিতেন।

জীবনের সৃষ্টিশীল সময়ের অর্ধেক তো দেশের সীমানার বাইরে থেকেই লেগে আছি, ঝুলে আছি দেশে। আমি ভাই লাচাড়। যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক আমি তোমায় ছাড়বো না মা। বিদেশের প্রতিকূল পরিবেশে যে এতদিন পাঁজরের পলে পলে বাংলাদেশকে ধরে রাখতে পেরেছি, তাতেও বাবা-মার প্রণোদনা আছে। তাঁরা ছাড়াও আমাদের বৃহত্তর পরিবার, কাছের মানুষ, আমার শিক্ষকগণ, কর্ম সহযোগী, যেসব পত্রিকা ও গণমাধ্যমে কাজ করেছি তার সম্পাদকগণ, বন্ধুমণ্ডলী, কার অনুপ্রেরণা ও অবদান নেই বলো! সবাই মিলেই আজকের এই আমিকে তৈরি করেছেন। আর এই সবাইকে কাছে টেনে নেবার কৌশল কিংবা তার মানসিকতা বোধকরি আম্মার কাছ থেকেই পেয়েছি।

ঘটনাগুলো ঘটে গেছে সেই শৈশবে। মা ছিলেন আমার রুচির আকর। আমার জন্য সেটা তিনি গড়ে গেছেন।

প্রশ্ন: মাকে আপনি কখনো মিস করেন?
উত্তর: মাকে কে না মিস করে! এখন আমার যে বয়স, এ বয়সে আমার মাকে দেখেছি, আর ভেবেছি কেন কেন মা বুড়িয়ে যাচ্ছে! কেন আমার মাকে আগের মতো করে পাচ্ছি না? কেন মা চলে যাবে? আর যখন গেলেন, আমার মনে হলো বাংলাদেশই হারিয়ে গেল। দেশে এলে তাঁকে আর পাবো না, সেজন্যে মাকে হারানোর পর ২ বছর দেশেই আসিনি।

মাকে মিস করি একা কোনো সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে, সন্ধ্যার মিশেল অন্ধকারে চা হাতে সিঙাড়ায় কামড় দিলে, আমার সন্তানদের সুখবরে, টগবগিয়ে উঠলে।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের রান্নার কথা বলুন। তাঁর করা কোন্ কোন্ রান্না আপনার বিশেষ পছন্দের, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?
উত্তর: উনি এত ভালো রাঁধতেন এবং আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের তা খাওয়াতেন যে একদিন কথাচ্ছলে শাহাদত ভাই-ই (সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা) তাঁকে বললেন, বিচিত্রায় আমার সম্পাদনার অংশ ‘জীবন এখন যেমন’ পাতায় রান্না লিখতে। সেই শুরু, আর তা থেকেই তাঁর বই। খাদ্যবিলাসের রান্নাগুলোতে তাঁর মায়া লেগে আছে। বিরুন চালের পোলাওয়ের সঙ্গে বড় বড় কই মাছে’র আত্লা খাট্টা, প্রেসার কুকারে রান্না সাদা খিচুড়ি ও টমেটো দিয়ে ডিমের ওমলেট। আহা! এসব খেলে বালিশ লাগে না। খাবার টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়তে হতো।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের কোন্ কোন্ গুণ আপনাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে?
উত্তর: সবই। কোনোটা বিশেষ বলে ভাবিনি। মার কি গুণ আছে না নেই, সে কথা মনেও হয় না। মা তো মা’ই। খালি সয়ে যাবে। হয়তো এই সেই বিশেষ গুণ।

প্রশ্ন: মাকে নিয়ে কোনো মর্মস্পর্শী বা অত্যন্ত আনন্দঘন কোনো ঘটনা থাকলে বলুন
উত্তর: একাত্তরে। বিজয়ের প্রাক্কালে যখন ক্ষণে ক্ষণে বোমা পড়ছে, এদিকে আব্বা রেডিও নিয়ে বসে আছেন। রাস্তা দিয়ে সব বিদেশি অ্যাম্বেসির গাড়ি তাদের মানুষদের এয়ারপোর্টে নিয়ে তুলে দিচ্ছে। এরই মধ্যে শেলিং শুরু হলেই আম্মা কলোনির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দৌড়ে পাঁচতলার ছাদে উঠে যেতেন। আমরা ভয়ে কাঁপতাম। আম্মা বিজয় দেখতে ভয় বাদ দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন: মায়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবার ব্যাপারে আপনার কোনো ধরনের উদ্যোগ আছে কি? যদি থেকে থাকে, তাহলে পাঠকবৃন্দের সঙ্গে সেটা শেয়ার করার জন্যে অনুরোধ জানাই।
উত্তর: আম্মার সূচিকর্ম নিয়ে একটি প্রদর্শনী করার আকাঙ্ক্ষা আছে। আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে সেটা করতে পারবো।

প্রশ্ন: আপনার এবং ভাইবোনদের জন্যে মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো স্মরণীয় ঘটনা আছে কি?
উত্তর: বড় ঘটনা নয় ছোট ছোট কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে খাবার টেবিলে। তিনি খেতেন ইলিশ মাছের সব চেয়ে কাঁটাওলা লেজ, মুরগির ডানা, বোয়ালের কান্শা। বলতেন, তাঁর কাছে ঐসব অংশ বড় স্বাদ লাগে। ছোটবেলা অবাক হয়ে ভাবতাম, মা’টা কি অদ্ভুত! ঐ সব কী কারো স্বাদ লাগে? বড় হয়ে বুঝেছি এটা ছিল অন্য সবার জন্য তার এই না-খাওয়া।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের দেওয়া কোনো বিশেষ পরামর্শ বা টিপসের কথা কী মনে পড়ে? কোনো উল্লেখযোগ্য উক্তি কী আপনাকে তাড়িয়ে ফেরে?
উত্তর: মা বলতেন, অল্পই কর, কিন্তু ভালো করে করো। বলতেন বরের সঙ্গে রাগ করলে কখনো গৃহত্যাগ করবে না। এটা কিন্তু তোমারো বাড়ি।

প্রশ্ন: সন্তানের জন্যে মায়ের যে সামগ্রিক শ্রম, সাধনা এবং ত্যাগ, সেসবের স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা আজকাল দেখি না। এ-ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কী, দয়া করে বলবেন?
উত্তর: কেন? দেখার তো কথা। এরা মা না? কারণ ব্যতিক্রম ছাড়া সব মা’ই এক রকম।

সাক্ষাৎকার: হাসান হাফিজ