শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / বাঙালির বৈশাখ উদযাপন
০৪/১১/২০১৭

বাঙালির বৈশাখ উদযাপন

-

বাংলা সনের প্রথম মাস, বৈশাখের প্রথম দিন নানারকম বহু আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা বরণ করে নিই বাংলা দিনপঞ্জিকার নতুন বছর -- বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আনন্দভরে উদযাপন করা হয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকোৎসব হিসেবে বিবেচিত।

নববর্ষের ইতিহাস
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। বর্তমানে নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার জন্য পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এক সময় নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ।

আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ-উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে পর্যায়ে এসেছে।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়।

মঙ্গল শোভাযাত্রা
নববর্ষের দিনটির প্রথম আকর্ষণই হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। থাকে বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বউমেলা
ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে, নাম বউমেলা। এটি স্থানীয়ভাবে ‘বটতলার মেলা’ নামেও পরিচিত। প্রায় ১০০ বছর ধরে চলে আসা এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজোর জন্য এখানে সমবেত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা তাঁদের মনের আশা পূরণের ইচ্ছায় এই মেলায় এসে পূজা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো। বর্তমানে কপোত-কপোতি উড়িয়ে শান্তির বার্তা পাওয়ার আশা করেন ভক্তরা।

ঘোড়ামেলা
সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় ঘোড়ামেলার। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর ওই স্থানে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা খায়। মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও সার্কাসের আয়োজন করা হয়। নানারকম আনন্দ-উৎসব করে লোকজন যখন অনেকটাই ক্লান্ত, তখনই এ-মেলার ক্লান্তি দূর করার জন্য নতুন মাত্রায় যোগ হয় কীর্তন। এ-কীর্তন চলে মধ্যরাত পর্যন্ত।

চট্টগ্রামে বর্ষবরণ
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্র ডিসি হিল পার্ক। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে প্রতিবছর পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মুক্ত মঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকে নানা গ্রামীণ পণ্যের পশরা, থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থা।

নগরীর অন্যান্য নিয়মিত আয়োজনের মধ্যে রয়েছে শিশু সংগঠন ফুলকির তিনদিনব্যাপী উৎসব, যা শেষ হয় বৈশাখের প্রথম দিবসে। নগরীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। এছাড়া সিআরবি-তেও মুক্তমঞ্চে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন থাকে।

- মিম রহমান