শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / পুরান ঢাকার পহেলা বৈশাখ
০৪/১১/২০১৭

পুরান ঢাকার পহেলা বৈশাখ

-

এই বাংলায় রয়েছে নানা উৎসব আর পার্বন। যে কোনো উৎসব মানুষের মাঝে ভেদাভেদ কমিয়ে দেয় সে যে বর্ণের আর ধর্মেরই হোক না কেন। উৎসব মানুষকে মানুষ ভাবতে শেখায়, শিক্ষা দেয় ভেদাভেদ আর শ্রেণী বৈষম্য ভুলে থাকতে। বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ বা পহেলা বৈশাখ - আমাদের বাঙালীর অন্যতম প্রধান উৎসব।

শুরুতে বাংলা নববর্ষের মূল বিষয় ছিল "হালখাতা"। মূলত আকবরের সময় থেকেই সকল প্রকার খাজনা-মাশুল-শুল্ক পরিশোধ করার উপর ভিত্তি করে সে সময় দিনটির প্রচলন ঘটে আর আমাদের দেশেও বলতে গেলে এই ধারাবাহিকতায় ব্যবসায়ীরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং পুরোনো সব হিসাব শেষ করে নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন স্থাপন করতেন মহাজনেরা।

সারাদেশসহ ব্যবসায়ের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকায় পহেলা বৈশাখে মূলত নতুন বছরের শুরুতে ব্যবসায়ীরা তাদের বিগত বছরের যাবতীয় দেনা-পাওনার হিসাব শেষ করে, হালনাগাদ করে নতুন খাতা খুলতেন আর শুভ এই কাজটি মিষ্টি মুখ করিয়ে সূচনা হতো যা হালখাতা নামে পরিচিত। পহেলা বৈশাখের সকালে পুরান ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে ব্যবসায়ীরা এখনো উৎসবমুখর পরিবেশে হালখাতা পালন করে থাকেন। এই দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর রাজধানী ঢাকা তথা পুরান ঢাকা ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র বিধায় হালখাতা প্রথম থেকেই পালন করা হতো ব্যবসায়িক স্থানগুলোতে সারাদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের সাথে। হালখাতাই ছিল পহেলা বৈশাখের মূল আনন্দ। এখনো বিশেষ করে পুরান ঢাকায় তাঁতীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানের স্বর্ণের দোকানগুলোতে হালখাতা পালন করা হয়ে থাকে।

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য উৎসবটি হয় ঢাকা শহরে আর সবচাইতে আকর্ষণীয় হচ্ছে বৈশাখী মেলা যাকে একসময় "চিল পূজা" মেলা বলা হতো। পুরান ঢাকাতে বাংলা সনের পহেলা বৈশাখের মতো এতো কাংখিত মেলা আর কিছু ছিল না। পুরান ঢাকার প্রাচীনতম মেলার মধ্যে প্রথমে গেন্ডারিয়ার লোহারপুল আর ধূপখোলা মাঠের মেলার কথাই চলে আসে। এখনো পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ধূপখোলা মাঠে প্রতি বছর বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সারা ঢাকার বিভিন্ন স্থানের মেলাপ্রেমী মানুষেরা ভীড় জমান। একসময় পুরান ঢাকার খাল ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর সাথে সংযুক্ত আর এই সমস্ত খালে দূর-দূরান্ত থেকে কুমাররা বড় নৌকায় করে আসতেন নানা মাটির খেলনা আর হাতে তৈরী নানা দ্রব্যাদি নিয়ে যা অদূরে ধূপখোলা মাঠে বিক্রি করা হতো। ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র পুরান ঢাকার চকবাজারেও মেলা বসতো প্রতি বৈশাখে আর এটিও সমান প্রসিদ্ধ ছিল। মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাগরদোলা।

পহেলা বৈশাখের মেলাতে ছেলে-বুড়ো সবাই যেতেন আর এই দিনটিতে পাড়ায়-মহল্লায়া এক উৎসবমূখর পরিবেশের সৃষ্টি হোত। ছোটদের প্রিয় ছিল মাটির তৈরী হুক্কা হাতে বৃদ্ধ, কলস হাতে বধূ, টমটম গাড়ি, বাঁশি, মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও ব্যাংক, মাটির ঘোড়া, মাছ, কলসি হাতে বধূ, টিনের তৈরী জাহাজ, কাঁচের তৈরী খেলনা, নানা রংয়ের কাঁচের চুঁড়ি আরও কত কি! শিশুদের পদচারণায় মেলার দিন ও পরবর্তী কয়েকদিন রাস্তা ও অলি-গলি মুখরিত থাকতো ঢোল, বাঁশি আর হাতে টানা মাটির টমটম গাড়ির শব্দে।

বৈশাখী মেলার অন্যতম আকর্ষণ মেলায় নানা ধরণের বিশেষ করে মিষ্টিজাতীয় খাবার। বাতাসা, খই, ওখড়া, চিড়া, মুড়ির মোয়া, কদমা, মিরচিনি-মুরালীসহ নানা মিষ্টিজাতীয় খাবার আর প্রচন্ড রোদে বরফ দেয়া ঠান্ডা শরবত ছিল মেলার প্রিয় পানীয়। পহেলা বৈশাখে ঘরে ঘরে বানানো হতো সবার পছন্দের যবের ছাতু আর নানা রকমের পুলি-পিঠা। হালের ইলিশ আর পান্তা তখনও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।

বুড়িগঙ্গার তীরের পুরান ঢাকাতে পহেলা বৈশাখ মানেই বৈশাখী মেলা আর নানা খাবারের আয়োজন। এমনিতেই ঐতিহ্যের পুরান ঢাকার মানুষ ভোজনরসিক আর যে কোনো উৎসবে যোগ হয় বাড়তি কিছু খাবারের পদ। ইলিশ-পান্তার পাশাপাশি অনেকেই এখনকার জনপ্রিয় নানা খাবারের আয়োজন করে থাকেন যার মধ্যে পোলাও-বিরিয়ানি থেকে শুরু করে থাকে নানা ধরণের নাশতা। জনপ্রিয় বাকরখানির সাথে খাওয়া হয় ঝাল মাংস, ফিরনি অথবা মিষ্টি। প্রতি বছরের মতো হোটেলগুলোতে থাকে বাড়তি আয়োজন যা ঢাকার নানাপ্রান্ত থেকে আসা ভোজন রসিক মানুষদের চাহিদার দিকে খেয়াল রেখে তৈরি করা হয়। পুরান ঢাকার নামী খাবারের ঠিকানাগুলোতে সকাল থেকেই ভীড় জমে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ। তাই পান্তাভাতের চেয়ে পুরান ঢাকার বিখ্যাত শাহী খাবারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দেখা যায় অনেক বেশি।

বৈশাখের প্রচন্ড গরমে পুরান ঢাকার নানা স্থানে বিখ্যাত লাচ্ছি, দই ও লেবুর শরবত আর ফালুদার প্রতি সবার আকর্ষণ থাকে। উপচে পরা ভিড়ে এইসবের যোগান দিতে দিতে ফুরসৎ থাকে না দোকানীদের।

প্রতি বছর উৎসব আসে মানুষের মনকে রাঙাতে আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য এক সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

- মোহাম্মদ ওয়াসিম
ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেইজঃ Puran Dhakar Khabar