শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / খাওয়া যখন নেশা!
০৩/১৬/২০১৬

খাওয়া যখন নেশা!

- নাইব

সারাদিনের কর্মব্যস্ত জীবনে অধিকাংশ মানুষের জন্য ক্ষণিক আনন্দের উপলক্ষ হলো খাওয়া-দাওয়া। তবে অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস অনেকসময় বিশাল বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। খাওয়ার টেবিলে বসে গোগ্রাসে গেলার এই অভ্যাসকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার’ নামে পরিচিত। খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত এই ডিসঅর্ডার নিয়ে আলোচনা থাকছে লেখার পরবর্তী অংশে।

‘বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার’ কী?
প্রচ- খিদে লাগলে হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা গোগ্রাসে গেলাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষ করে বিয়ে বা জন্মদিনের দাওয়াতে গলা পর্যন্ত না খাওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়। তবে ‘বিঞ্জ ইটিং’ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে এই অতিভোজন কালেভদ্রে না হয়ে বরং অভ্যাসে পরিণত হয়। এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাই ক্ষুধা না থাকলেও টেবিলে যা পান খেয়ে সাবাড় করে ফেলেন। কিছুক্ষণ আগে ভরপেট খাওয়ার পরেও তাই ব্যক্তি খাওয়ার টেবিলে নতুন কোনো আইটেম দেখলে লোভ সামলাতে পারেন না। দিনে দিনে এই ধরনের অভ্যাস ভয়ানক হয়ে দাঁড়ায় এবং খাওয়ার সময় ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে প্রায়ই নানাশারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। বিঞ্জ ইটিং-এ আক্রান্ত ব্যক্তি বন্ধু বা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বাইরে ঘুরতে গেলে সবচেয়ে বিপদে পড়েন। নিজের এ ধরনের খাদ্যাভ্যাসের ফলে হীনম্মন্যতায় ভোগেন, যা তার স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে বাধা সৃষ্টি করে।

কারণ-

ঠিক কী কারণে ব্যক্তির জীবনে এই ডিসঅর্ডারের আবির্ভাব ঘটে তা একেবারে নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যক্তির জিনগত বৈশিষ্ট্য, মানসিকতা এবং পারিবারিক ইতিহাস এই ডিসঅর্ডারের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। এমনকি খাওয়া-দাওয়ার প্রতি তীব্র অনীহা, কিংবা অতিরিক্ত ডায়েটিং প্রবণতা একটা সময় সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডারে রূপ নিতে পারে। এছাড়া জীবনে ঘটে যাওয়া বড় কোনো দুর্ঘটনা যেমন প্রিয়জনের মৃত্যু কিংবা অতিরিক্ত ওজনের কারণে ক্রমাগত ঠাট্টা-বিদ্রুপের শিকার হওয়ার ফলে হতাশ হয়ে ব্যক্তি এই ডিসঅর্ডারের দিকে ধাবিত করতে পারেন।

সমস্যা যখন প্রকট
স্থান-কাল-বয়স-লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কেউ বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডারের শিকার হতে পারেন। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে নারীদের ক্ষেত্রে এই মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিঞ্চিৎ বেশি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০ লাখ নর-নারীর উপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এদের মধ্যে ২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩.৫ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই ডিসঅর্ডারের শিকার হয়েছেন।
অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মেদ বা স্থূলতাজনিত সমস্যায় ভোগেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে স্থূলতায় ভুগছেন এমন মানুষদের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশেরই বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার রয়েছে। বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার একসময় মনের দরোজা পার করে শরীরেও আঘাত হানতে পারে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চরক্তচাপসহ নানামারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে এই ডিসঅর্ডার।

প্রতিকারের উপায়-

আশার কথা হলো মারাত্মক কোনো ক্ষতির আগেই এই মানসিক প্রদাহ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এর জন্য সবার আগে ব্যক্তি আসলেই এই ডিসঅর্ডারে ভুগছেন কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন মেডিকেল টেস্ট এবং নিজের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য দেয়ার মাধ্যমে এই মানসিক রোগ মোকাবেলার পথে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে শুরু থেকেই একজন মনোবিদের পরামর্শ নিয়ে ধাপে-ধাপে এগোনোই ভাল। মনোবিদের সঙ্গে বিভিন্ন সেশন ও থেরাপিতে অংশ নিয়ে মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি নিজের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ও ওজন নিয়ন্ত্রণের দিকেও গুরত্বারোপ করতে হবে। বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার সম্পূর্ণ একটি মানসিক সমস্যা বিধায় নির্দিষ্ট কোনো ঔষধ সেবনের মাধ্যমে প্রতিকারের আশা না করাই ভালো। তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট সেবনে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

জীবনে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অনেক গুরত্বপূর্ণ। তবে বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডারের মতো জটিল মানসিক সমস্যা আপনার চলার পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আগে থেকেই সচেতন থাকুন, সুস্থদেহে, সুস্থমনে বাঁচুন।