বুধবার,২৩ অগাস্ট ২০১৭
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / বাইপোলার ডিসঅর্ডার -- বিচিত্র এক মানসিক ব্যাধি
০৪/০৪/২০১৭

বাইপোলার ডিসঅর্ডার -- বিচিত্র এক মানসিক ব্যাধি

-

হতাশা কোনো রোগ নয়, একটি মানসিক অবস্থা মাত্র। কিন্তু হতাশার ঘটনাটি কোনো মানুষের জীবনে যদি নিয়মিত ফেরত আসে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি একাধারে বিষণ্ণ আবার অতিরিক্ত উৎফুল­ এবং হাইপার হয়ে যায়, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বাইপোলার ডিসঅর্ডার রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বাইপোলার ডিসঅর্ডার বিভিন্ন কারণে হতে পারে। বায়োলজিকাল কারণেই যে সিংহভাগ সময়ে বাইপোলার ডিসঅর্ডার হয়, এমনটা ভাবনা চিকিৎসকদের। কিছুক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের নিরন্তর অপ্রাপ্তিও অনেকসময় মানুষকে বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত করে। কিছুক্ষেত্রে বাস্তবতার একঘেয়ে ব্যাপারগুলো মানুষকে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এনে দেয়। জীবনের কোনো কাজেই যেন তার আনন্দ নেই, আবার নেই কোন অভিযোগ। কবি জীবনানন্দ দাশের "বোধ" কবিতার দু’টি চরণ উদ্ধৃত করা যায় এখানে।

"সব কাজ তুচ্ছ হয়, পন্ড মনে হয়,
সব চিন্তা প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।"

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের রোগীদের অনেকগুলো প্রাথমিক লক্ষণ আছে। যেমন তাদের হঠাৎ হঠাৎ অতি অল্প কারণে মাত্রাতিরিক্ত আনন্দ লাগে। তেমনি করে সামান্য দুঃখেই মন ভেঙে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির এখনি দম ফাটানো হাসি পায় তো এখনি ভয়াবহ মন খারাপ হয়। অর্থাৎ তার অনুভূতিগুলো খুব দ্রুত একটি থেকে আরেকটি অবস্থায় রূপান্তরিত হয়। সঙ্গীহীন অথবা সঙ্গীসহ অবস্থা তার কাছে খুব আলাদা কিছু অর্থ বহন করে না। তার ঘুম কম হয়। যে কোনো বিষয়ে তার বিচার-বিবেচনা অত্যন্ত দুর্বল ও অযৌক্তিক হয়। অনেকসময় বাইপোলার ডিসঅর্ডার থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সে আসক্ত হয়ে যায় মদ ও অন্যান্য মাদকে। তার কর্ম¯পৃহা কমে যায়। কোনো জায়গায় গেলে তার মনে আনন্দ আসে না। বন্ধুদের সঙ্গেও ভালো লাগে না। রাত্রি জাগা হয়। ফলে ঘুমের চাহিদায় দিনের বেলায় কিছু করাই হয় না। একা থাকার মুহূর্তে তার কান্না পেতে পারে এবং আত্মহত্যার একটি চিন্তাভাবনা তার মনে খেলা করে। এসময়ে অনিয়মিত আহারের কারণে তার খাবারদাবারের বিষয়টিও তাকে স্বাস্থ্যের নানা ঝামেলার সম্মুখীন করে।

বছরের বিভিন্ন সময়ে বাইপোলার ডিসর্ডারের রোগীরা বিশেষভাবে আক্রান্ত হতে পারে। একেকবারের ক্রনিক ডিপ্রেশনে চার থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বাইপোলার ডিসঅর্ডার ঔষধ খেয়ে ভালো হবার রোগ যে নয়, তা বিজ্ঞ পাঠক এতক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা। তবে চিকিৎসকেরা মনে করেন যে, কিছু বিশেষ ঔষধ কিছুটা উপকারে আসতে পারে। নিয়মিত ঘুমানোর সঙ্গে আমাদের মানসিক অবস্থা অত্যন্ত গভীরভাবে জড়িত। তবে ডিপ্রেশনের জন্য ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করলে তা ক্ষতিই বেশি করবে। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট/মনোচিকিৎসকের থেরাপি কাজে আসতে পারে এক্ষেত্রে। তবে প্রাথমিকভাবে নিজের কাছের মানুষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করলেও উপকার পাওয়া যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ। বাইপোলার ডিসঅর্ডারকে উসকে দেয়, এমন কিছু বিষয়ের কথা মাথায় রাখতে হবে। এতে নিয়ত হতাশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। উদাহরণ হিসেবে অনেক কাজের চাপ, কম ঘুম, অর্থনৈতিকভাবে অচল হয়ে পড়া মানুষের বাইপোলার ডিসঅর্ডারকে উসকে দেয়ার কারণ হতে পারে।

বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রয়োজন তার আশপাশের মানুষের সহযোগিতা। যারা তাকে পুনরায় জীবনমুখী করে তুলবে। পৃথিবীর অনেক অনেক বিখ্যাত মানুষ একটা সময়ে বাইপোলার ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ছিলেন। পরে তারা তাদের কাজ দিয়ে মানুষের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন। দস্তয়ভস্কি, আলব্যের কামু থেকে শুরু করে ফ্রানৎস কাফকার মত বিখ্যাত সাহিত্যিকের রচনায় বারবার এসেছে ব্যক্তির হতাশার নানা জটিল দিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে মানুষের ইতিহাসেই একধরনের পরিবর্তন এসেছে, মানুষ তার অস্তিত্ব নিয়ে আগের চেয়ে বেশি চিন্তা করেছে। সুতরাং বাইপোলার ডিসঅর্ডারকে জুজু না ভেবে এর সম্মুখীন হওয়াই ভালো।

- জারিফ