রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন: শঙ্কা ও উদ্বেগ
০৩/২০/২০১৭

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন: শঙ্কা ও উদ্বেগ

-

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭। ‘বিশেষ সুযোগ’ এর বিধান রেখে আইনটি পাস হওয়ায় এই আইন থেকে সুফল শেষ পর্যন্ত কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সঙ্কট ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ সুযোগ-এর সুবিধা নিয়ে ১৮ বছরের কম বয়সেও বিয়ে দেওয়া যাবে। শঙ্কা ও উৎকণ্ঠার জায়গাটা এখানেই। আমরা জানি, বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় বাল্যবিবাহের একাধিক কারণ রয়েছে।

দারিদ্র্যের অভিশাপ তার মধ্যে অন্যতম। কন্যাশিশুকে কোনোমতে পাত্রস্থ করে অভিভাবকরা দায়মুক্তি ও স্বস্তি খোঁজেন। কিন্তু অনিবার্য পরিণতি হিসেবে অনেকগুলো বিপদ-বিপর্যয় সৃষ্টি হয় এতে। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। সামগ্রিক বিবেচনায় তা সমস্যা দূর করার পরিবর্তে সঙ্কটকে ঘনীভূত করে। তৈরি পোশাক খাতে বিপুলসংখ্যক নারীশ্রমিক কাজ করছেন, এই খাত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান একটি উৎস। বিশেষ সুযোগে এই নারীশ্রমিকদের অল্প বয়সে বিবাহের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যায়। তারা নিজেরা ও সন্তানেরা সমাজের একপ্রকার বোঝা হিসেবে পরিগণিত হন। সেটি সমাজের ভারসাম্যই শুধু নষ্ট করে না, ঈপ্সিত প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথকে বাধাগ্রস্ত করে।

নতুন আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে যা ঘটবে, তাতে সরকার প্রত্যাশিত ফল পাবেন বলে মনে হয় না। ভুয়া জন্মসনদ দেখিয়ে বিয়ে দেওয়া হবে। ধর্ষণকে রোধ করার যুক্তি হিসেবে যে এই বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে, তাও কতটা ফলদায়ক হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। ধর্ষণের শাস্তির জন্য আলাদা আইন করে তার কঠোর প্রয়োগ করা যেতে পারে। আস্তে আস্তে আমাদের অভ্যাস বদলাতে হবে। বর্তমান সরকারের নেয়া অজস্র নারীবান্ধব কর্মসূচি ও পদক্ষেপ অনেক প্রশংসাযোগ্য। বহু ক্ষেত্রে নারীপ্রগতির সূচক ঊর্ধ্বগামী। কিন্তু নতুন এই আইনটিতে সেরকম ধারাবাহিকতা ও সদিচ্ছার প্রত্যাশিত প্রতিফলন ঘটেনি। ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় নারী সংগঠনগুলো সরকারকে ‘বিশেষ সুযোগ’ বিধানটি না রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি কোনো।

এই আইন নারীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। নারীর সম্ভ্রমহানিজনিত যে বিচার-আচার, সেই পথ আরো কণ্টকিত হওয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই আইন পাস হওয়ার ফলে মেয়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, সামাজিক নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। বিবাহ নামের বন্ধন ও সামাজিক প্রথা নিয়ে আমরা যে গর্ব করি, তার ওপরও গুরুতর আঘাত আসতে পারে এই আইনের কারণে। ছেলেদেরও আটকানো হয়েছে কম বয়সে বিয়ের ফাঁদে। ভবিষ্যতে অল্প বয়সী মায়েরাই শুধু নন, তাদের সন্তানরাও অতিরিক্ত স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।

ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তরা শাস্তি এড়ানোর জন্য বিয়ে করবে। শেষ অব্দি সেই বিয়ে আদৌ টিকবে কি টিকবে না, সেই প্রশ্নের চাইতেও বড় বিপদের ব্যাপার আছে। সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় দেখা গেছে, চাপ এড়াতে না পেরে এক ধর্ষক বিয়ে ঠিকই করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সে তার স্ত্রীকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ধর্ষণ-পরবর্তী সময়ের জোর জবরদস্তিমূলক বিয়ে টেকসই হয় না। বরঞ্চ নানা অশান্তি, ঝুটঝামেলার জন্ম দেয়। বলা হচ্ছে, সদ্য পাস হওয়া এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। মহান আদালতের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার কোনো সমাধান পাওয়া যায় কিনা, সেটা দেখার জন্য আমরা অধীর অপেক্ষায় রইলাম।

- তাসমিমা হোসেন